পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৫৭১

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


শান্তিনিকেতন (3J বল, রামানন্দ বল, কবীর বল, চৈতন্য বল, সকলেই রসের আঘাতে বাধন ভেঙে দিয়ে সকল মানুষকে এক জায়গায় ডাক দিয়েছেন । তাই বলছিলুম, ধর্ম যখন আচারকে নিয়মকে শাসনকে আশ্রয় করে কঠিন হয়ে ওঠে, তখন সে মানুষকে বিভক্ত করে দেয়, পরম্পরের মধ্যে গতিবিধির পথকে অবরুদ্ধ করে । ধর্মে যখন রসের বর্ষা নেবে। আসে তখন যে-সকল গহবর পরস্পরের মধ্যে ব্যবধান রচনা করেছিল, তারা ভক্তির স্রোতে প্রেমের বন্যায় ভরে ওঠে এবং সেই পূর্ণতায় স্বাতন্ত্র্যের অচল সীমাগুলিই সচল হয়ে উঠে অগ্রসর হয়ে সকলকে মিলিয়ে দিতে চায়, বিপরীত পারকে এক করে দেয় এবং দুর্লঙ্ঘ্য দূরকে আনন্দবেগে নিকট করে আনে । মানুষ যখনই সত্যভাবে গভীরভাবে মিলেছে তখন কোনো-একটি বিপুল রসের আবির্ভাবেই মিলেছে, প্রয়োজনে মেলে নি, তত্ত্বজ্ঞানে মেলে নি, আচারের শুষ্ক শাসনে মেলে নি । ধর্মের যখন চরম লক্ষ্যই হচ্ছে ঈশ্বরের সঙ্গে মিলনসাধন, তখন সাধককে এ কথা মনে রাখতে হবে যে, কেবল বিধিবদ্ধ পূজাৰ্চনা আচার অনুষ্ঠান শুচিতার দ্বারা তা হতেই পারে না। এমন-কি, তাতে মনকে কঠোর করে ব্যাঘাত আনে এবং ধাৰ্মিকতার অহংকার জাগ্রত হয়ে চিত্তকে সংকীর্ণ করে দেয় । হৃদয়ে রস থাকলে তবেই তার সঙ্গে মিলন হয়, আর-কিছুতেই হয় না । কিন্তু এই কথাটি মনে রাখতে হবে, ভক্তিরসের প্ৰেমরসের মধ্যে যে দিকটি সম্ভোগের দিক, কেবল সেইটিকেই একান্ত করে তুললে দুর্বলতা এবং বিকার ঘটে । ওর মধ্যে একটি শক্তির দিক আছে, সেটি না থাকলে রসের দ্বারা মনুষ্যত্ব দুৰ্গতিপ্ৰাপ্ত হয় । ভোগই প্রেমের একমাত্র লক্ষণ নয়। প্রেমের একটি প্রধান লক্ষণ হচ্ছে এই যে, প্ৰেম আনন্দে দুঃখকে স্বীকার করে নেয় । কেননা দুঃখের দ্বারা, ত্যাগের দ্বারাই তার পূর্ণ সার্থকতা । ভাবাবেশের মধ্যে নয়— সেবার মধ্যে, কর্মের মধ্যেই তার পূর্ণ পরিচয় । এই দুঃখের মধ্যে দিয়ে, কর্মের মধ্যে দিয়ে, তপস্যার মধ্যে দিয়ে যে প্রেমের পরিপাক হয়েছে, সেই প্ৰেমই বিশুদ্ধ থাকে এবং সেই প্রেমই সর্বাঙ্গীণ হয়ে ওঠে । এই দুঃখস্বীকারই প্রেমের মাথার মুকুট ; এই তার গৌরব । ত্যাগের দ্বারাই সে আপনাকে লাভ করে ; বেদনার দ্বারাই তার রসের মন্থন হয় ; সাধবী সতীকে যেমন সংসারের কর্ম মলিন করে না, তাকে আরো দীপ্তিমতী করে তোলে, সংসারে মঙ্গলকর্ম যেমন তার সতী প্ৰেমকে সার্থক করতে থাকে, তেমনি যে সাধকের চিত্ত ভক্তিতে ভরে উঠেছে, কর্তব্যের শাসন তার পক্ষে শৃঙ্খল নয়— সে তার অলংকার ; দুঃখে তঁর জীবন নত হয় না, দুঃখেই তার ভক্তি গৌরবান্বিত হয়ে ওঠে । এইজন্যে মানবসমাজে কর্মকাণ্ড যখন অত্যন্ত প্ৰবল হয়ে উঠে মনুষ্যত্বকে ভারাক্রান্ত করে তোলে, তখন একদল বিদ্রোহী জ্ঞানের সহায়তায় কর্মমাত্রেরই মূল উৎপাটন এবং দুঃখমাত্রকে একান্তভাবে নিরস্ত করে দেবার অধ্যবসায়ে প্রবৃত্ত হন । কিন্তু যারা ভক্তির দ্বারা পূর্ণতার স্বাদ পেয়েছেন, তারা কিছুকেই অস্বীকার করবার প্রয়ােজন বােধ করেন না— তারা অনায়াসেই কর্মকে শিরোধাৰ্য এবং দুঃখকে বরণ করে নেন । নইলে-যে তাদের ভক্তির মহাত্ম্যই থাকে না, নইলে-যে ভক্তিকে অপমান করা হয় ; ভক্তি বাইরের সমস্ত অভাব ও আঘাতের দ্বারাই আপনার ভিতরকার পূর্ণতাকে আপনার কাছে সপ্রমাণ করতে চায়- দুঃখে নম্রতা ও কর্মে আনন্দই তার ঐশ্বর্যের পরিচয় । কর্মে মানুষকে জড়িত করে এবং দুঃখ তাকে পীড়া দেয়, রসের আবির্ভাবে মানুষের এই সমস্যাটি একেবারে বিলুপ্ত হয়ে যায়, তখন কর্ম এবং দুঃখের মধ্যেই মানুষ যথার্থভাবে আপনার মুক্তি উপলব্ধি করে । বসন্তের উত্তাপে পর্বতশিখরের বরফ যখন রসে বিগলিত হয়, তখন চলাতেই তার মুক্তি, নিশ্চলতাই তার বন্ধন ; তখন আক্রান্ত আনন্দে দেশদেশান্তরকে উর্বর করে সে চলতে থাকে ; তখন নুড়িপাথরের দ্বারা সে যতই প্ৰতিহত হয় ততই তার সংগীত জাগ্রত এবং নৃত্য উচ্ছসিত হয়ে ওঠে । একটা বরফের পিণ্ড এবং ঝরনার মধ্যে তফাত কোনখানে । না, বরফের পিণ্ডের নিজের মধ্যে গতিতত্ত্ব নেই। তাকে বেঁধে টেনে নিয়ে গেলে তবেই, সে চলে । সুতরাং চলাটাই তার বন্ধনের পরিচয় । এইজন্যে বাইরে থেকে তাকে ঠেলা দিয়ে চালনা করে নিয়ে গেলে প্রত্যেক আঘাতেই সে ভেঙে যায়, তার ক্ষয় হতে থাকে- এইজন্য চলা ও আঘাত থেকে নিষ্কৃতি পেয়ে স্থির নিশ্চল হয়ে থাকাই তার পক্ষে স্বাভাবিক অবস্থা ।