পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৫৮১

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


শান্তিনিকেতন Gł6łS এবং পোষণ করে, কিন্তু পৃথিবীতে জন্মমাত্র তার সেই নিজের একমাত্র কেন্দ্ৰত্ব ঘুচে যায়- এখানে সে । অনেকের অন্তর্বতী । স্বার্থলোকেও আমিই হচ্ছি। কেন্দ্ৰ, অন্য-সমস্ত তার পরিধি- মঙ্গললোকে আমিই কেন্দ্ৰ নই, আমি সমগ্রের অন্তর্বতী ; সুতরাং এই সমগ্রের প্রাণেই সেই আমির প্রাণ, সমগ্রের ভালোমন্দই তার ভালোমন্দ । পৃথিবীতে আমাদের দৈহিক জীবন একেবারেই পাকা হয় না। যদিও মুক্ত আকাশে আমরা জন্মগ্রহণ করি বটে, তবু শক্তির অভাবে আমরা মুক্তভাবে সঞ্চারণ করতে পারি। নে ; মায়ের কোলেই, ঘরের সীমার মধ্যেই আবদ্ধ হয়ে থাকি। তার পরে ক্রমশই পরিপুষ্ট ও সাধনা থেকে পৃথিবীলোকে আমাদের মুক্ত অধিকার বিস্তৃত হতে থাকে । বাইরের দিক থেকে এ যেমন, অন্তরের দিক থেকেও আমাদের দ্বিতীয় জন্মের সেইরকমের একটি ক্ৰমবিকাশ আছে। ঈশ্বর যখন স্বার্থের জীবন থেকে আমাদের মঙ্গলের জীবনে এনে উপস্থিত করেন, তখন আমরা একেবারেই পূর্ণ শক্তিতে সেই জীবনের অধিকার লাভ করতে পারি নে। ভূণত্বের জড়তা আমরা একেবারেই কাটিয়ে উঠি নে । তখন আমরা চলতে চাই, কারণ চারিদিকে চলার ক্ষেত্র অবাধ-বিস্তৃত— কিন্তু চলতে পারি নে, কেননা আমাদের শক্তি অপরিণত । এই হচ্ছে দ্বন্দ্বের অবস্থা । শিশুর মতো চলতে গিয়ে বার বার পড়তে হয় এবং আঘাত পেতে হয় ; যতটা চলি তার চেয়ে পড়ি অনেক বেশি । তবুও ওঠা ও পড়ার এই সুকঠোর বিরোধের মধ্য দিয়েই মঙ্গললোকে আমাদের মুক্তির অধিকার ক্রমশ প্রশস্ত হতে থাকে । কিন্তু শিশু যখন মায়ের কোলে প্ৰায় অহােরাত্র শুয়ে-ঘুমিয়েই কাটাচ্ছে তখনো যেমন জানা যায়, সে এই চলা-ফেরা-জাগরণের পৃথিবীতেই জন্মগ্রহণ করেছে এবং তার সঙ্গে বয়স্কদের সাংসারিক সম্বন্ধ অনুভব করতে কোনো সংশয়মাত্র থাকে না, তেমনি যখন আমরা স্বাৰ্থলোক থেকে মঙ্গললোকে প্রথম ভূমিষ্ঠ হই তখন পদে পদে আমাদের জড়ত্ব ও অকৃতাৰ্থতা সত্ত্বেও আমাদের জীবনের ক্ষেত্রপরিবর্তন হয়েছে, সে কথা একরকম করে বুঝতে পারা যায়। এমন-কি, জড়তার সঙ্গে নবলব্ধ চেতনার বহুতরো বিরোধের দ্বারাই সেই খবরটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে । বস্তুত, স্বার্থের জঠরের মধ্যে মানুষ যখন শয়ান থাকে, তখন সে দ্বিধাহীন আরামের মধ্যেই কালব্যাপন করে । এর থেকে যখন প্ৰথম মুক্তিলাভ করে, তখন অনেক দুঃখস্বীকার করতে হয়, তখন নিজের সঙ্গে उनक म९शीभ काठ श् । তখন ত্যাগ তার পক্ষে সহজ হয় না। কিন্তু তবু তাকে ত্যাগ করতেই হয়, কারণ এ লোকের জীবনই হচ্ছে ত্যাগ । তখন তার সমস্ত চেষ্টার মধ্যে সম্পূর্ণ আনন্দ থাকে না, তবু তাকে চেষ্টা করতেই হয় । তখন তার মন যা বলে তার আচরণ তার প্রতিবাদ করে ; তার অন্তরাত্মা যে ডালকে আশ্রয় করে, তার ইন্দ্ৰিয় তাকেই কুঠারাঘাত করতে থাকে ; যে শ্রেয়কে আশ্রয় করে সে অহংকারের হাত থেকে নিষ্কৃতি পাবে, অহংকার গোপনে সেই শ্রেয়কেই আশ্রয় করে গভীরতররূপে আপনাকে পোষণ করতে থাকে । এমনি করে প্রথম অবস্থায় বিরোধ-অসামঞ্জস্যের বিষম ধদের মধ্যে পড়ে। তার আর দুঃখের অন্ত থাকে না । আমি আজ তোমাদের মধ্যে যেখানে এসেছি, এখানে আমার পূর্বজীবনের অনুবৃত্তি নেই। বস্তুত, সে জীবনকে ভেদ করেই এখানে আমাকে ভূমিষ্ঠ হতে হয়েছে । এইজন্যেই আমার জীবনের উৎসব সেখানে বিলুপ্ত হয়ে এখানেই প্রকাশ পেয়েছে। দেশালাইয়ের কাঠির মুখে যে আলো একটুখানি দেখা দিয়েছিল, সেই আলো আজ প্ৰদীপের বাতির মুখে ধ্রুবতার হয়ে জ্বলে উঠেছে। কিন্তু এ কথা তোমাদের কাছে নিঃসন্দেহই অগোচর নেই যে, এই নুতন জীবনকে আমি শিশুর মতো আশ্রয় করেছি মাত্র, বয়স্কের মতো একে আমি অধিকার করতে পারি নি। তবু আমার সমস্ত দ্বন্দ্ব এবং অপূর্ণতার বিচিত্র অসংগতির ভিতরেও আমি তোমাদের কাছে এসেছি, সেটা তোমরা উপলব্ধি করেছএকটি মঙ্গললোকের সম্বন্ধে তোমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আমি তোমাদের আপনি হয়েছি, সেইটে তোমরা হৃদয়ে জেনেছ- এবং সেইজন্যেই আজ তোমরা আমাকে নিয়ে এই উৎসবের আয়োজন করেছ, এ কথা যদি সত্য হয়, তবেই আমি আপনাকে ধন্য বলে মনে করব ; তোমাদের সকলের আনন্দের মধ্যে আমার নূতন জীবনকে সার্থক বলে জানিব । bT | MON2