পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৫৮৭

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


শান্তিনিকেতন (2○○。 হয়ে দুঃখকে স্বীকার করতে, সুখকে বিসর্জন করতে প্ৰবৃত্ত করে-তাতেই কেবল জানিয়ে দিতে থাকে, সুখে । স্বার্থে মানুষের স্থিতি নেই- তার থেকে নিজান্ত হবার জন্যে মানুষকে বন্ধনের পর বন্ধন ছেদন করতে হবে- মঙ্গলের স্নাম্বন্ধে বিশ্বের সঙ্গে যোগযুক্ত হয়ে মানুষকে মুক্তিলাভ করতে হবে । এই স্বার্থের আবরণ থেকে নিষ্ক্রান্ত হওয়াই হচ্ছে স্বাৰ্থও পরমার্থের সামঞ্জস্যসাধন । কারণ, স্বার্থের মধ্যে আবৃত থাকলেই তাকে সত্যরূপে পাওয়া যায় না। স্বাৰ্থ থেকে যখন আমরা বহির্গত হই, তখনই আমরা পরিপূর্ণরূপে স্বার্থকে লাভ করি। তখনই আমরা আপনাকে পাই বলেই অন্য-সমস্তকেই পাই। গর্ভের শিশু নিজেকে জানে না বলেই তার মাকে জানে না- যখনই মাতার মধ্য হতে মুক্ত হয়ে সে নিজেকে জানে, তখনই সে মাকে জানে । সেইজন্যে যতক্ষণ স্বার্থের নাড়ীর বন্ধন ছিন্ন করে মানুষ এই মঙ্গললোকের মধ্যে জন্মলাভ না করে, ততক্ষণ তার বেদনার অন্ত নেই। কারণ, যেখানে তার চরম স্থিতি নয়, যেখানে সে অসম্পূর্ণ, সেখানেই চিরদিন স্থিতির চেষ্টা করতে গেলেই তাকে কেবলই টানাটানির মধ্যে থাকতে হবে । সেখানে সে যা গড়ে তুলবে তা ভেঙে পড়বে, যা সংগ্ৰহ করবে তা হারাবে এবং যাকে সে সকলের চেয়ে লোভনীয় বলে কামনা করবে। তাই তাকে আবদ্ধ করে ফেলবে । তখন কেবল আঘাত, কেবল আঘাত । তখন পিতার কাছে আমাদের কামনা এই-- মা মা হিংসীঃআমাকে আঘাত কোরো না, আমাকে আর আঘাত কোরো না । আমি এমন করে কেবলই দ্বিধার মধ্যে আর दै ि6रू । কিন্তু এ পিতারই হাতের আঘাত— এ মঙ্গললোকের আকর্ষণেরই বেদনা। নইলে পাপে দুঃখ থাকত না- পাপ বলেই কোনো পদার্থ থাকত না, মানুষ পশুদের মতো অপাপ হয়ে থাকত। কিন্তু মানুষকে মানুষ হতে হবে বলেই এই দ্বন্দ্ব, এই বিদ্রোহ, বিরোধ, এই পাপ, এই পাপের বেদন । তাই জন্যে মানুষ ছাড়া এ প্রার্থনা কেউ কোনোদিন করতে পারে না- বিশ্বানি দেব সবিতরুদূরিতানি পরাসুব- হে দেব, হে পিতা, আমার সমস্ত পাপ দূর করে দাও । এ ক্ষুধামোচনের প্রার্থনা নয়, এ প্রয়োজনসাধনের প্রার্থনা নয়— মানুষের প্রার্থনা হচ্ছে, “আমাকে পাপ হতে মুক্ত করো। তা না করলে আমার দ্বিধা ঘুচাবে না- পূর্ণতার মধ্যে আমি ভূমিষ্ঠ হতে পারছি নে- হে অপাপবিদ্ধ নির্মল পুরুষ, তুমিই যে আমার পিতা, এই বোধ আমার সম্পূর্ণ হতে পারছে না- তোমাকে সত্যভাবে নমস্কার করতে পারছি GN s’ যদভদ্রং তন্ন আসুব— যা ভালো তাই আমাদের দাও । মানুষের পক্ষে এ প্রার্থনা অত্যন্ত কঠিন প্রার্থনা। কেননা মানুষ যে দ্বন্দ্বের জীব- ভালো যে মানুষের পক্ষে সহজ নয়। তাই, যদভদ্রং তন্ন আসুব, এ আমাদের ত্যাগের প্রার্থনা, দুঃখের প্রার্থনা-নাড়ীছেদনের প্রার্থনা । পিতার কাছে এই কঠোর প্রার্থনা মানুষ ছাড়া আর-কেউ করতে পারে না । পিতানোেহসি, পিতা নো বোধি, নমস্তেহত্ত— যজুর্বেদের এই মন্ত্রটি নমস্কারের প্রার্থনা ; তুমি আমাদের পিতা, তোমাকে আমাদের পিতা বলে যেন বুঝি এবং তোমাতে আমাদের নমস্কার যেন সত্য হয় । অর্থাৎ আমার দিকেই সমস্ত টানবার যে একটা প্ৰবৃত্তি আছে, সেটাকে নিরস্ত করে দিয়ে তোমার দিকেই সমস্ত যেন নত করে সমর্পণ করে দিতে পারি। তা হলেই যে দ্বন্দ্বের অবসান হয়ে যায়— আমার যেখানে সার্থকতা সেইখানেই পৌঁছতে পারি। সেখানে যে পৌঁচেছি সে কেবল তোমাকে নমস্কারের দ্বারাই চেনা যায় ; সেখানে কোনো অহংকার টিকতেই পারে না- ধনী সেখানে দরিদ্রের সঙ্গে তোমার পায়ের কাছে এসে মেলে, তত্ত্বজ্ঞানী সেখানে মূঢ়ের সঙ্গেই তোমার পায়ের কাছে এসে নত হয়। মানুষের দ্বন্দ্বের যেখানে অবসান সেখানে তোমাকে পরিপূর্ণ নমস্কার, অহংকারের একান্ত বিসর্জন । এই নমস্কারটি কেমন নমস্কার ?-- নমঃ সম্ভব।ায় চ ময়োভবায় চ, নমঃ শঙ্করায় চ ময়ঙ্করায় চ, নমঃ শিবায় চ শিবতরায় চ |