পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৫৮৯

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


শান্তিনিকেতন @VցԳ আমাদের পিতা সুখের মধ্যে আমাদের বদ্ধ হতে দেন না, কেননা সমগ্রের সঙ্গে আমাকে যুক্ত হতে হবে- এবং সেই যোগের মধ্য দিয়েই তার সঙ্গে আমার সত্য যোগ । এই সমগ্রের সঙ্গে যাতে আমাদের যোগসাধন করে তাকেই বলে মঙ্গল। এই মঙ্গলবোধই মানুষকে কিছুতেই সুখের মধ্যে স্থির থাকতে দিচ্ছে না- এই মঙ্গলবোধই পাপের বেদনায় মানুষকে এই কান্না কঁদোচ্ছে ; মা মা হিংসীঃ, বিশ্বানি দেব সবিতরন্দুরিতানি পরাসুব, যদভদ্রং তন্ন আসুব । সমস্ত খাওয়াপরার কান্না ছাড়িয়ে এই কান্না উঠেছে, “আমাকে দ্বন্দ্বের মধ্যে রেখে আর আঘাত কোরো না, আমাকে পাপ থেকে মুক্ত করো ; আমাকে সম্পূর্ণ তোমার মধ্যে আনন্দে নত করে দাও।” তাই মানুষ এই বলে নমস্কারের সাধনা করছে ; নমঃ সম্ভবায়চ ময়োভবায় চ- সেই সুখকর যে তাকেও নমস্কার, আর সেই কল্যাণকর যে তাকেও নমস্কার- একবার মাতারূপে তাকে নমস্কার, একবার পিতারূপে তাকে নমস্কার । মানবজীবনের দ্বন্দ্বের দোলার মধ্যে চড়ে যেদিকেই হেলি সেইদিকে তাকেই নমস্কার করতে শিখতে হবে । তাই বলি : নমঃ শঙ্করায় চ ময়স্করায় চ- সুখের আকর যিনি তাকেও নমস্কার, মঙ্গলের । আকর যিনি তাকেও নমস্কার- মাতা যিনি সীমার মধ্যে বেঁধে ধারণ করছেন, পালন করছেন, তাকেও নমস্কার, আর পিতা যিনি বন্ধন ছেদন করে অসীমের মধ্যে আমাদের পদে পদে অগ্রসর করছেন, তাকেও নমস্কার । অবশেষে দ্বিধা অবসান হয় যখন সব নমস্কার একে এসে মেলে। তখন : নমঃ শিবায় চ শিবতরায় চ- তখন সুখে মঙ্গলে আর ভেদ নেই, বিরোধ নেই— তখন শিব, শিব, শিব, তখন শিব এবং শিবতর— তখন পিতা এবং মাতা একই - তখন একমাত্র পিতা— এবং দ্বিধাবিহীন নিস্তব্ধ প্ৰশান্ত মানবজীবনের একটিমাত্র চরম নমস্কার নমঃ শিবায় চ শিবতরায় চ | নিবাত নিষ্কম্প দীপশিখার মতো উৰ্ব্বগামী একাগ্র এই নমস্কার, অনুত্তরঙ্গ মহাসমুদ্রের মতো দশদিগন্তব্যাপী বিপুল এই নমস্কার নমঃ শিবায় চ শিবতরায় চ | २२ ဈချီ ́ আমাদের এই আশ্রমবাসী আমার একজন তরুণ বন্ধু এসে বললেন, ‘আজ আমার জন্মদিন ; আজ আমি আঠারো পেরিয়ে উনিশ বছরে পড়েছি।” র্তার সেই যৌবনকালের আরম্ভ, আর আমার এই প্রৌঢ়বয়সের প্রান্ত- এই দুই সীমার মাঝখানকার কালটিকে কত দীর্ঘ বলেই মনে হয় । আমি আজ যেখানে দাড়িয়ে তার এই উনিশ বছরকে দেখছি, গণনা ও পরিমাপ করতে গেলে সে কত দূরে । তার এবং আমার বয়সের মাঝখানে কত আবাদ, কত ফসল ফলা, কত ফসল কাটা, কত ফসল নষ্ট হওয়া, কত সুভিক্ষ এবং কত দুৰ্ভিক্ষ প্রতীক্ষা করে রয়েছে তার ঠিকানা Gre যে ছাত্র তার কলেজ-শিক্ষার প্রায় শেষ সীমায় এসে পৌচেছে, সে যখন শিশুশিক্ষা এবং ধারাপাত হাতে কোনো ছেলেকে পাঠশালায় যেতে দেখে, তখন তাকে মনে মনে কৃপাপাত্রই বলে জ্ঞান করে । কেননা কলেজের ছাত্র এ কথা নিশ্চয় জানে যে, ঐ ছেলে শিক্ষার যে আরম্ভভাগে আছে সেখানে পূর্ণতার এতই অভাব যে, সেই শিশুশিক্ষা-ধারাপাতের মধ্যে সে রসের লেশমাত্র পায় না- অনেক দুঃখ ক্লেশ তাড়নার কাটাপথ ভেঙে তবে সে এমন জায়গায় এসে পৌঁছবে যেখানে তার জ্ঞান নিজের জ্ঞাতব্য বিষয়ের মধ্যে আপনাকে আপনি উপলব্ধি করতে করতে আনন্দিত হতে থাকবে । কিন্তু মানুষের জীবন বলে যে শিক্ষালয়টি আছে তার আশ্চর্য রহস্য এই যে, এখানকার পাঠশালার ছোটাে ছেলেকেও এখানকার এম. এ. ক্লাসের প্রবীণ ছাত্র কৃপাপাত্র বলে মনে করতে পারে না ।