পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৫৯০

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


GłVer রবীন্দ্র-রচনাবলী তাই আমার পরিণত বয়সের সমস্ত অভিজ্ঞতা ও চিত্তবিস্তার সত্ত্বেও আমি আমার উনিশ বছরের বন্ধুটিকে ষ্ঠার তারুণ্য নিয়ে অবজ্ঞা করতে পারি। নে । বস্তুত তার এই বয়সে যত অভাব ও অপরিণতি আছে, তারাই সব চেয়ে বড়ো হয়ে আমার চোখে পড়ছে না ; এই বয়সের মধ্যে যে একটি সম্পূর্ণতা ও সৌন্দৰ্য আছে, সেইটেই আমার কাছে আজ। উজ্জ্বল হয়ে দেখা দিচ্ছে । মানুষের কাজের সঙ্গে ঈশ্বরের কাজের এইখানে একটি প্রভেদ আছে। মানুষের ভারাবাধা অসমাপ্ত ইমারত সমাপ্ত ইমারতের কাছে লজ্জিত হয়ে থাকে । কিন্তু ঈশ্বরের চারাগাছটি প্ৰবীণ বনস্পতির কাছেও দৈন্য প্ৰকাশ করে না । সেও সম্পূর্ণ, সেও সুন্দর। সে যদি চারা অবস্থাতেই মারা যায়, তবু তার কোথাও অসমাপ্তি ধরা পড়ে না। ঈশ্বরের কাজে কেবল যে অন্তেই সম্পূর্ণতা তা নয়, তার সোপানে সোপানেই ণতা । * মুকদিন তাে শিশু ছিলুম। সেদিনের কথা তো ভুলি নি । তখন জীবনের আয়োজন অতি যৎসামান্য ছিল। তখন শরীরের শক্তি, বুদ্ধি ও কল্পনা যেমন অল্প ছিল, তেমনি জীবনের ক্ষেত্র এবং উপকরণও নিতান্ত সংকীর্ণ ছিল। ঘরের মধ্যে যে অংশ অধিকার করেছিলুম তা ব্যাপক নয়, এবং ধুলার ঘর আর মাটির পুতুলই দিন কাটাবার পক্ষে যথেষ্ট ছিল । অথচ আমার সেই বাল্যের জীবন আমার সেই বালক আমির কাছে একেবারে পরিপূর্ণ ছিল। সে-যে কোনো অংশেই অসমাপ্ত, তা আমার মনেই হতে পারত না । তার আশাভরসা হাসিকান্না লাভক্ষতি নিজের বাল্যগাণ্ডির মধ্যেই পর্যাপ্ত হয়ে ছিল । তখন যদি বড়োবয়সের কথা কল্পনা করতে যৌতুম, তবে তাকে বৃহত্তর বাল্যজীবন বলেই মনে হতঅর্থাৎ রূপকথা খেলনা এবং লজঞ্জসের পরিমাণকে বড়ো করে তোলা ছাড়া আর-কোনো বড়োকে স্বীকার করার কোনো প্রয়োজন বোধ করাতুম না । এ যেন ছবির তাসে ক খ শেখার মতো । কয়ে কাক, খয়ে খঞ্জন, গয়ে গাধা, ঘয়ে ঘোড়া । শুদ্ধমাত্র কি খ শেখার মতো অসম্পূর্ণ শেখা আর-কিছু হতেই পারে না। অক্ষরগুলোকে যোজনা করে যখন শব্দকে ও বাক্যকে পাওয়া যাবে, তখনই ক খ শেখার সার্থকতা হবে ; কিন্তু ইতিমধ্যে ক খ অক্ষর সেই কাকের ও খঞ্জনের ছবির মধ্যে সম্পূর্ণতা লাভ করে শিশুর পক্ষে আনন্দকর হয়ে উঠে- সে ক খ অক্ষরের দৈন্য অনুভব করতেই পারে না । তেমনি শিশুর জীবনে ঈশ্বর তার জগতের পুঁথিতে যে-সমস্ত রঙচঙ-করা কখয়ের ছবির পাতা খুলে রাখেন, তাই বার বার উলটে-পালটে তার আর দিনরাত্রির জ্ঞান থাকে না । কোনো অর্থ, কোনো ব্যাখ্যা, কোনো বিজ্ঞান, কোনো তত্ত্বজ্ঞান তার দরকারই হয় না— সে ছবি দেখেই খুশি হয়ে থাকে ; মনে করে, এই ছবি দেখাই জীবনের চরম সার্থকতা । তার পরে আঠারো বৎসর পেরিয়ে যেদিন উনিশে পা দিলুম, সেদিন খেলনা লজঞ্জুস ও রূপকথা । একেবারে তুচ্ছ হয়ে গেল । সেদিন যে-ভাব রাজ্যের সিংহদ্বারের সমুখে এসে দাঁড়ালুম, সে একেবারে সোনার আভায় ঝলমল করছে এবং ভিতর থেকে যে-একটি নহবতের আওয়াজ আসছে, তাতে প্ৰাণ উদাস করে দিচ্ছে। এতদিন ছিলুম। বাইরে, কিন্তু সাহিত্যের নিমন্ত্রণচিঠি পেয়ে মানুষের মানসলোকের রসভাণ্ডারে প্রবেশ করা গেল । মনে হল, এই যথেষ্ট, আর-কিছুরই প্রয়োজন নেই। এমনি করে মাধ্যযৌবনে যখন পৌঁছনো গেল তখন বাইরের দিকে আর-একটা দরজা খুলে গেল। তখন এই মানসলোকের বাহির-বাড়িতে ডাক পড়ল। মানুষ যেখানে বসে ভেবেছে, আলাপ করেছে, গান গেয়েছে, ছবি এঁকেছে সেখানে নয়- ভাব যেখানে কাজের মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে, সেই মস্ত খোলা জায়গায়। মানুষ যেখানে লড়াই করেছে, প্রাণ দিয়েছে, যেখানে অসাধ্যসাধনের জয়পতাকা হাতে অশ্বমেধের ঘোড়া নিয়ে নদী পর্বত সমুদ্র উত্তীর্ণ হতে চলেছে সেইখানে । সেখানে সমাজ আহবান করছে, সেখানে দেশ হাত বাড়িয়ে আছে- সেখানে উন্নতিতীর্থের দুৰ্গম শিখর মেঘের মধ্যে প্রচ্ছন্ন থেকে সুমহৎ ভবিষ্যতের দিকে তর্জনী তুলে রয়েছে। এই-বা কী বিরাট ক্ষেত্ৰ ! এই যেখানে যুগে যুগে সমস্ত মহাপুরুষ প্ৰাণ দিয়ে এসেছেন, এখানে প্ৰাণ আপনাকে নিঃশেষ করে দিতে পারলেই নিজেকে সার্থক বলে মনে করে ।