পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৫৯৫

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


শান্তিনিকেতন (ሱዓw© আমাদের কিছুই আসে যায় না- সুতরাং মৃত্যুতে তারা আমাদের কাছে একেবারেই বিলুপ্ত হয়ে যায় । এইখানেই মৃত্যুকে আমরা বিনাশ বলেই জানি। কিন্তু এ মৃত্যুর অর্থ কী ভেবে দেখো । যে-মানুষকে আনন্দের মধ্যে দেখি নি, তাকে অমৃতের মধ্যেই দেখি নি- আমার পক্ষে সে কেবলমাত্র চোখে- দেখা কানে-শোনার অনিত্য লোকেই এতদিন ছিল- যেখানে তাকে সত্যরূপে বৃহৎ রূপে অমররূপে দেখতে পেতুম, সেখানে সে আমাকে দেখা দেয় নি । যেখানে আমার প্ৰেম সেইখানেই আমি নিত্যের স্বাদ পাই, অমৃতের পরিচয় পেয়ে থাকি । সেখানে । মানুষের উপর থেকে তুচ্ছতার আবরণ চলে যায়, মানুষের মূল্যের সীমা থাকে না । সেই প্রেমের মধ্যে যে মানুষকে দেখেছি, তাকেই আমি অমৃতের মধ্যে দেখেছি। সমস্ত সীমাকে অতিক্রম করে তার মধ্যে অসীমকে দেখতে পাই এবং মৃত্যুতেও সে আমার কাছে মরে না । যাকে আমরা ভালোবাসি মৃত্যুতে সে যে থাকবে না, এই কথাটা আমাদের সমস্ত চিত্ত অস্বীকার করে ; প্ৰেম যে তাকে নিত্য বলেই জানে, সুতরাং মৃত্যু যখন তার প্রতিবাদ করে, তখন সেই প্রতিবাদকে মেনে নেওয়া তার পক্ষে এতই কঠিন হয়ে ওঠে । যে-মানুষকে আমরা অমৃতলোকের মধ্যে দেখেছি, তাকে মৃত্যুর মধ্যে দেখব কেমন করে ! মনের ভিতরে তখন একটি কথা এই ওঠে- প্রেম কি কেবল আমারই ? কোনো বিশ্বব্যাপী প্রেমের যোগে কি আমার প্ৰেম সত্য নয় ? যে-শক্তিকে অবলম্বন করে আমি ভালোবাসছি, আনন্দ পাচ্ছি, সেই শক্তিই কি সমস্ত বিশ্বে সকলের প্রতিই আনন্দিত হয়ে আছেন না ? আমার প্রেমের মধ্যে এমন যে একটি অমৃত আছে, যে-অমৃতে আমার প্ৰেমাস্পদ আমার কাছে এমন চিরন্তন সত্য- সেই অমৃত কি সেই অনন্ত প্রেমের মধ্যে নেই ? তার সেই অনন্ত প্রেমের সুধায় আমরা কি অমর হয়ে উঠি নি ? যেখানে তার আনন্দ সেইখানেই কি অমৃত নেই ? প্রিয়জনের মৃত্যুর পরে প্রেমের আলোকে আমরা এই অনন্ত অমৃতলোককে আবিষ্কার করে থাকি । সেই তো আমাদের শ্রদ্ধার দিন— সত্যের প্রতি শ্রদ্ধা, অমৃতের প্রতি শ্রদ্ধা । শ্রাদ্ধের দিনে আমরা মৃত্যুর সম্মুখে । দাড়িয়ে অমৃতের প্রতি সেই শ্রদ্ধা নিবেদন করি ; আমরা বলি, মাকে দেখছি নে কিন্তু মা আছেন । চোখে দেখে, হাতে ছুয়ে যখন বলি “মা আছেন, তখন সে তো শ্ৰদ্ধা নয়— আমার সমস্ত ইন্দ্ৰিয় যেখানে শূন্যতার সাক্ষ্য দিচ্ছে সেখানে যখন বলি “মা আছেন, তখন তাকেই যথাৰ্থ বলে শ্রদ্ধা। নিজে যতক্ষণ পাহারা দিচ্ছি। ততক্ষণ যাকে বিশ্বাস করি, তাকে কি শ্রদ্ধা করি ? গোচরে এবং অগোচরেও যার উপর আমার বিশ্বাস অটল, তারই উপর আমার শ্রদ্ধা । মৃত্যুর অন্ধকারময় অন্তরালেও যাকে আমার সমস্ত চিত্ত সত্য বলে উপলব্ধি করছে, তাকেই তো যথার্থ আমি সত্য বলে শ্রদ্ধা করি । সেই শ্রদ্ধাই প্ৰকাশ করার দিন শ্রাদ্ধের দিন। মাতার জীবিতকালে যখন বলেছি, “মা তুমি আছ- তার চেয়ে ঢের পরিপূর্ণ করে বলা, আজকের বলা যে, মা তুমি আছ ।” তার মধ্যে আর-একটি গভীরতর শ্রদ্ধার কথা আছে ঃ পিতা নোহসি । “হে আমার অনন্ত পিতামাতা, তুমি আছ, তাই আমার মাকে কোনো দিন হারাবার জো নেই । যেদিন বিশ্বব্যাপী অমৃতের প্রতি এই শ্রদ্ধা সমুজ্জ্বল হয়ে ওঠবার দিন, সেইদিনকারই আনন্দমন্ত্র হচ্ছে মধুবাতা ঋতীয়তে মধুক্ষরন্তি সিন্ধবঃ মাধবীর্নঃ সন্তোষধীঃ । মধুনিক্তম উতোষসঃ মধুমৎ পার্থিবং রজঃ মধু দৌরস্তুনঃ পিতা । মধুৰ্যান্নো বনস্পতিঃ মধুমান অস্তু সূৰ্যঃ মাঘীৰ্গাবো ভবন্তু নঃ। এই আনন্দমন্ত্রের দ্বারা পৃথিবীর ধূলি থেকে আকাশের সূর্য পর্যন্ত সমস্তকে অমৃতে অভিষিক্ত করে মধুময় করে দেখবার দিন এই শ্রান্ধের দিন। সত্যম।— তিনি সত্য, অতএব সমস্ত তীর মধ্যে সত্য, এই শ্রদ্ধা যেদিন