পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৫৯৬

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


(¢ዒ8 রবীন্দ্র-রচনাবলী পূর্ণভাবে বিকশিত হয়ে ওঠে, সেই দিনই আমরা বলতে পারি আনন্দম-তিনি আনন্দ এবং তার মধ্যেই সমস্ত আনন্দে পরিপূর্ণ। tr Ve ve শেষ গানে সম আছে, ছন্দে যতি আছে এবং এই যে লেখা চলছে, এই লেখার অন্য-সকল অংশের চেয়ে দাড়ির প্ৰভুত্ব কিছুমাত্র কম নয়। এই দাঁড়িগুলোই লেখার হাল ধরে রয়েছে- একে একটানা নিরুদ্দেশের মধ্যে হু । হু করে ভেসে যেতে দিচ্ছে না। ’ বস্তুত কবিতা যখন শেষ হয়ে যায়, তখন সেই শেষ হয়ে যাওয়াটাও কবিতার একটা বৃহৎ অঙ্গ। কেননা কোনো ভালো কবিতাই একেবারে শূন্যের মধ্যে শেষ হয় না- যেখানে শেষ হয় সেখানেও সে কথা বলে- এই নিঃশব্দে কথাগুলি বলবার অবকাশ তাকে দেওয়া চাই । যেখানে কবিতা থেমে গেল। সেখানেই যদি তার সমস্ত সুর সমস্ত কথা একেবারেই ফুরিয়ে যায়, তা হলে সে নিজের দীনতার জন্যে লজ্জিত হয়। কোনো-একটা বিশেষ উপলক্ষে প্ৰাণপণে ধুমধাম করে যে-ব্যক্তি একেবারে দেউলে হয়ে যায়, সেই ধুমধামের দ্বারা তার ঐশ্বৰ্য প্রকাশ পায় না, তার দারিদ্র্যই সমুজ্জ্বল হয়ে ve3dò | নদী যেখানে থামে। সেখানে একটি সমুদ্র আছে বলেই থামে- তাই থেমে তার কোনো ক্ষতি নেই। বিস্তুত এ কেবল এক দিক থেকে থামা, অন্য দিক থেকে থামা নয় । মানুষের জীবনের মধ্যেও এইরকম অনেক থামা আছে। কিন্তু প্ৰায় দেখা যায়, মানুষ থামতে লজ্জা বোধ করে। সেইজন্যেই আমরা ইংরেজের মুখে প্রায় শুনতে পাই যে জিন-লাগাম-পরা অবস্থায় দীেড়তে দীেড়তে মুখ থুবড়ে মরাই গৌরবের মরণ । আমরাও এই কথাটা আজকাল ব্যবহার করতে অভ্যাস করছি। কোনাে-একটা জায়গায় পূর্ণতা আছে, এ কথা মানুষ যখন অস্বীকার করে তখন চলাটাকেই মানুষ একমাত্র গৌরবের জিনিস বলে মনে করে । ভোগ বা দান যে জানে না, সঞ্চয়কেই সে একান্ত করে জানে । কিন্তু ভোগের বা দানের মধ্যে সঞ্চয় যখন আপনাকে ক্ষয় করতে থাকে তখন এক আকারে সঞ্চায়ের অবসান হয় বটে, কিন্তু আর-এক আকারে তারই সার্থকতা হতে থাকে । যেখানে সঞ্চায়ের এই সার্থক অবসান নেই। সেখানে লজ্জাজনক কৃপণতা । জীবনকে যারা এইরকম কৃপণের মতো দেখে, তারা কোথাও কোনোমতেই থামতে চায় না, তারা কেবলই বলে, “চলো, চলো, চলো ।” থামার দ্বারা তাদের চলা সম্পূর্ণ ও গভীর হয়ে ওঠে না ; তারা চাবুক এবং লাগামকেই স্বীকার করে, বৃহৎ এবং সুন্দর শেষকে তারা মানে না । তারা যৌবনকে যৌবন পেরিয়েও টানাটানি করে নিয়ে চলে ; সেই দুঃসাধ্য ব্যাপারে কাঠ খড় এবং চেষ্টার আর অবধি থাকে না- তা ছাড়া কত লজা, কত ভাবনা, কত ভয় । ফল যখন পাকে তখন শাখা ছেড়ে যাওয়াই তার গৌরব । কিন্তু শাখা ত্যাগ করাকে যদি দীনতা বলে মনে করে, তবে তার মতো কৃপাপাত্র আর কে আছে। নিজের স্থানকে অধিকার করার সঙ্গে সঙ্গে এই কথাটি মনের মধ্যে রাখতে হবে যে, এই অধিকারকে সম্পূর্ণ করে তুলে একে ত্যাগ করে যাব । ‘এই অধিকারকে যেমন করে পারি শেষ পর্যন্ত টােনাহেঁচড়া করে রক্ষা করতেই হবে- তাতেই আমার সম্মান, আমার কৃতিত্ব এই শিক্ষাই যারা শিশুকাল থেকে শিখে এসেছে, অপঘাত যতক্ষণ তাদের পেয়াদার মতো এসে জোর করে টেনে নিয়ে না যায় ততক্ষণ তারা দুই হাতে আসন আঁকড়ে পড়ে থাকে । 疆 আমাদের দেশে অবসানকে স্বীকার করে, এইজন্যে তার মধ্যে আগীেরব দেখতে পায় না। এইজন্যে ত্যাগ করা তার পক্ষে ভঙ্গ দেওয়া নয় ।