পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৬০২

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


aro রবীন্দ্র-রচনাবলী আপনার রসোচ্ছাসের সাড়া পেতেন, তিনি যে তার জীবনেশ্বরকে কিরকম নিবিড় রসবেদনাপূর্ণ মাধুর্যঘন প্রেমের সঙ্গে অন্তরে বাহিরে দেখেছিলেন, সে কথা অধিক করে বলাই বাহুল্য । ঐকান্তিক জ্ঞানের সাধনা যেমন শুষ্ক বৈরাগ্য আনে, ঐকান্তিক রসের সাধনাও তেমনি ভাববিহবলতার বৈরাগ্য নিয়ে আসে । সে অবস্থায় কেবলই রসের নেশায় আবিষ্ট হয়ে থাকতে ইচ্ছা করে, আর-সমস্তের প্রতি একান্ত বিতৃষ্ণা জন্মে এবং কর্মের বন্ধনমাত্রকে অসহ্য বলে বোধ হয়। অর্থাৎ মনুষ্যত্বের কেবল একটিমাত্র দিক অত্যন্ত প্ৰবল হয়ে ওঠাতে অন্য সমস্ত দিক একেবারে রিক্ত হয়ে যায়, তখন আমরা ভগবানের উপাসনাকে কেবলই একটিমাত্র অংশে আত্মগ্র করে তুলি, এবং অন্য সকল দিক থেকেই তাকে শূন্য করে রাখি । ভগবৎলাভের জন্য একান্ত ব্যাকুলতা সত্ত্বেও এইরকম সামঞ্জস্যচ্যুত বৈরাগ্য মহৰ্ষির চিত্তকে কোনোদিন অধিকার করে নি। তিনি সংসারকে ত্যাগ করেন নি, সংসারের সুরকে ভগবানের ভক্তিতে বেঁধে তুলেছিলেন । ঈশ্বরের দ্বারা সমস্তকেই আচ্ছন্ন করে দেখবে, উপনিষদের এই উপদেশবাক্য অনুসারে তিনি র্তার সংসারের বিচিত্র সম্বন্ধ ও বিচিত্র কর্মকে ঈশ্বরের দ্বারাই পরিব্যাপ্ত করে দেখবার তপস্যা করেছিলেন । কেবল নিজের পরিবার নয়, জনসমাজের মধ্যেও ব্ৰহ্মকে উপলব্ধি করবার সমস্ত বিদ্ম দূর করতে তিনি চিরজীবন চেষ্টা করেছেন । এইজন্য এই শান্তিনিকেতনের বিশাল প্ৰান্তরের মধ্যেই হােক আর হিমালয়ের নিভৃত গিরিশিখরেই হােক, নির্জন সাধনায় তাকে বেঁধে রাখতে পারে নি। তার ব্ৰহ্ম একলার ব্ৰহ্ম নয়— র্তার ব্ৰহ্ম শুধু জ্ঞানীর ব্ৰহ্ম নয়, শুধু ভক্তের ব্ৰহ্মও নয়, তার ব্ৰহ্ম নিখিলের ব্ৰহ্ম ; নির্জনে তার ধ্যান, সজনে তার সেবা ; অন্তরে তার স্মরণ, বাহিরে তার অনুসরণ ; জ্ঞানের দ্বারা তার তত্ত্ব-উপলব্ধি, হৃদয়ের দ্বারা তার প্রতি প্ৰেম, চরিত্রের দ্বারা তার প্রতি নিষ্ঠা এবং কর্মের দ্বারা তার প্রতি আত্মনিবেদন । এই যে পরিপূর্ণস্বরূপ ব্ৰহ্ম, সর্বাঙ্গীণ মনুষ্যত্বের পরিপূর্ণ উৎকর্ষের দ্বারাই আমরা র্যার সঙ্গে যুক্ত হতে পারি।-- তার যথার্থ সাধনাই হচ্ছে তার যোগে সকলের সঙ্গে যুক্ত হওয়া এবং সকলের যোগে তারই সঙ্গে যুক্ত হওয়া- দেহ মন হৃদয়ের সমস্ত শক্তির দ্বারাই তাকে উপলব্ধি করা এবং তার উপলব্ধির দ্বারা দেহমনহদায়ের সমস্ত শক্তিকে বলশালী করা- অর্থাৎ পরিপূর্ণ সামঞ্জস্যের পথকে গ্রহণ করা। মহর্ষি তার ব্যাকুলতার দ্বারা এই সম্পূর্ণতাকেই চেয়েছিলেন এবং তার জীবনের দ্বারা একেই নির্দেশ করেছিলেন । ব্ৰহ্মের উপাসনা কাকে বলে সে সম্বন্ধে তিনি বলেছেন : তস্মিন গ্ৰীতিস্তস্য প্রিয়কাৰ্যসাধনঞ্চ তদুপাসনমেব। তাতে গ্ৰীতি করা এবং তঁর প্রিয়কাৰ্য সাধন করাই তার উপাসনা। এ কথা মনে রাখতে হবে, আমাদের দেশে ইতিপূর্বে র্তার প্রতি শ্ৰীতি এবং তার প্রিয়কাৰ্য-সাধন, এই উভয়ের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে গিয়েছিল । অন্তত প্রিয়কাৰ্য শব্দের অর্থকে আমরা অত্যন্ত সংকীর্ণ করে এনেছিলুম ; ব্যক্তিগত শুচিতা এবং কতকগুলি আচার পালনকেই আমরা ঈশ্বরের প্রিয়কাৰ্য বলে স্থির করে রেখেছিলুম। কর্ম যেখানে দুঃসাধ্য, যেখানে কঠোর, কমে যেখানে যথার্থ বীর্যের প্রয়োজন, যেখানে বাধার সঙ্গে সংগ্ৰাম করতে হবে, যেখানে অমঙ্গলের কণ্টকতারুকে রক্তাক্ত হন্তে সমুলে উৎপাটন করতে হবে, যেখানে অপমান নিন্দা নির্যাতন স্বীকার করে প্রাচীন অভ্যাসের স্কুল জড়ত্বকে কঠিন দুঃখে ভেদ করে জনসমাজের মধ্যে কল্যাণের প্রতিষ্ঠা করতে হবে, সেই দিকে আমরা দেবতার উপাসনাকে স্বীকার করি নি। দুর্বলতাবশতই এই পূর্ণ উপাসনায় আমাদের অনাস্থা ছিল এবং অনাস্থা ছিল বলেই আমাদের দুর্বলতা এ পর্যন্ত কেবলই বেড়ে এসেছে। ভগবানের প্রতি শ্ৰীতি ও র্তার প্রিয়কাৰ্যসাধনের মাঝখানে আমাদের চরিত্রের মজাগত দুর্বলতা যে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দিয়েছিল সেই বিচ্ছেদ মিটিয়ে দেবার পথে একদিন মহর্ষি একলা দাড়িয়েছিলেন- তখন তার মাথার উপরে বৈষয়িক বিপ্লবের প্রবল ঝড় বইতেছিল এবং চতুর্দিকে বিচ্ছিন্ন পরিবার ও বিরুদ্ধ সমাজের সর্বপ্রকার আঘাত এসে পড়ছিল, তারই মাঝখানে অবিচলিত শক্তিতে একাকী দাঁড়িয়ে তিনি তার বাক্যে ও ব্যবহারে এই মন্ত্র ঘোষণা করেছিলেন : তস্মিন গ্ৰীতিস্তস্য প্রিয়কাৰ্যসাধনঞ্চ তদুপাসনমেব।। ভারতবর্ষ তার দুৰ্গতিদুর্গের যে রুদ্ধ দ্বারে শতাব্দীর পর শতাব্দী যাপন করেছে- আপনার ধর্মকে সমাজকে, আপনার আচারব্যবহারকে কেবলমাত্র আপনার কৃত্রিম গণ্ডির মধ্যে বেষ্টিত করে বসে রয়েছে, সেই দ্বার বাইরের পৃথিবীর প্রবল আঘাতে আজ ভেঙে গেছে ; আজ আমরা সকলের কাছে প্ৰকাশিত হয়ে