পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৬০৬

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


Gr8 রবীন্দ্র-রচনাৱলী সমস্ত জগৎ আমাকে প্রার্থনা করে, আমার সেবা করে, তার শতসহস্ৰ তেজ ও আলোকের নাড়ীর সূত্রে আমার সঙ্গে বিচিত্র সম্বন্ধ স্থাপন করে- আমার দিকে তাকিয়ে তার সমস্ত লোক লোকান্তর পরম আদরে এই কথা বলে যে, “তুমি আমার যেমন এমনটি কোথাও আর-কেউ নেই, অনন্তের মধ্যে তুমিই কেবল “তুমি, সেইখানে আমার চেয়ে বড়ো আর কে আছে। এই বড়োর দিকে যখন আমি জাগ্রত হই, সেই দিকে আমার যেমন শক্তি, যেমন প্ৰেম, যেমন আনন্দ, সেই দিকে আমার নিজের কাছে নিজের উপলব্ধি যেমন পরিপূর্ণ এমন ছোটোর দিকে কখনোই নয়। সকল স্বার্থের সকল অহংকারের অতীত সেই আমার বড়ো আমিকে সকলের চেয়ে বড়ো-আমির মধ্যে ধরে দেখবার দিনই হচ্ছে আমাদের বড়েদিন । জগতে আমাদের প্রত্যেকেরই একটি বিশেষ স্থান আছে । আমরা প্ৰত্যেকেই একটি বিশেষ আমি । সেই বিশেষত্ব একেবারে অটল অটুট ; অনন্ত কালে অনন্ত বিশ্বে আমি যা আর কেউ তা নয় । তা হলে দেখা যাচ্ছে এই—যে আমিত্ব বলে একটি জিনিস, এর দ্বারাই জগতের অন্য সমস্ত-কিছু হতেই আমি স্বতন্ত্র । আমি জানছি যে আমি আছি, এই জানাটি যেখানে জাগছে সেখানে অস্তিত্বের সীমাহীন জনতার মধ্যে আমি একেবারে একমাত্র । আমিই হচ্ছি। আমি, এই জানাটুকুর অতি তীক্ষু খড়েগির দ্বারা এই কণামাত্র আমি ত্মবশিষ্ট ব্ৰহ্মাণ্ডকে নিজের থেকে একেবারে চিরবিচ্ছিন্ন করে নিয়েছে, নিখিল-চরাচরকে আমি এবং আমি-না। এই দুই ভাগে বিভক্ত করে ফেলেছে। কিন্তু এই-যে ঘর ভাঙবার মূল আমি, মিলিয়ে দেবার মূলও হচ্ছেন উনি । পৃথক না হলে মিলনও হয় না ; তাই দেখতে পাচ্ছি। সমস্ত জগৎ জুড়ে বিচ্ছেদের শক্তি আর মিলনের শক্তি, বিকর্ষণ এবং আকর্ষণ, প্ৰত্যেক অণু-পরমাণুর মধ্যে কেবলই পরস্পর বোঝাপড়া করছে। আমার আমির মধ্যেও সেই বিশ্বব্যাপী প্ৰকাণ্ড দুই শক্তির খেলা ; তার এক শক্তি প্রবল হাত দিয়ে ঠেলে ফেলছে, আর-এক শক্তি প্রবল হাত দিয়ে টেনে নিচ্ছে । এমনি করে আমি এবং আমি-না’র মধ্যে কেবলই আনাগোনার জোয়ার-ভাটা চলেছে । এমনি করে আমি আমাকে জনছি বলেই তার প্রতিঘাতে সকলকে জানিছি, এবং সকলকে জানিছি বলেই তার প্ৰতিঘাতে আমাকে জানিছি। বিশ্ব-আমির সঙ্গে আমার আমির এই নিত্যকালের ঢেউ-খেলাখেলি । এই এক আমিকে অবলম্বন করে বিচ্ছেদ ও মিলন উভয় তত্ত্বই আছে বলে আমিটুকুর মধ্যে অনন্ত দ্বন্দ্ব । যে দিকে সে পৃথক সেই দিকে তার চিরদিনের দুঃখ, যে দিকে সে মিলিত সেই দিকে তার চিরকালের আনন্দ ; যে দিকে সে পৃথক সেই দিকে তার স্বার্থ, সেই দিকে তার পাপ, যে দিকে সে মিলিত সেই দিকে তার ত্যাগ, সে দিকে তার পুণা ; যে দিকে সে পৃথক সেই দিকেই তার কঠোর অহংকার, যে দিকে সে মিলিত সেই দিকেই তার সকল মাধুর্যের সার প্ৰেম । মানুষের এই আমির এক দিকে ভেদ এবং আর-এক দিকে অভেদ আছে বলেই মানুষের সকল প্রার্থনার সার প্রার্থনা হচ্ছে দ্বন্দ্বসমাধানের প্রার্থনা ; অসতো মা সদগময়, তমসো মা জ্যোতিৰ্গময়, মৃতোমামৃতং গময় । সাধক কবি কবীর দুটিমাত্ৰ ছত্রে আমি-রহস্যের এই তত্ত্বটি প্রকাশ করেছেন যব হম রহল রিহা নাই কোঈ, হামরে মাহ রহিল সব কোঈ । অর্থাৎ, আমির মধ্যে কিছুই নেই। কিন্তু আমার মধ্যে সমস্তই আছে। অর্থাৎ, এই আমি এক দিকে সমস্ত হতে পৃথক হয়ে অন্য দিকে সমস্তকেই আমার করে নিচ্ছে। এই আমার দ্বন্দ্বনিকেতন আমিকে আমার ভগবান নিজের মধ্যে লোপ করে ফেলতে চান না, একে নিজের মধ্যে গ্ৰহণ করতে চান । এই আমি তার প্রেমের সামগ্ৰী ; একে তিনি অসীম বিচ্ছেদের দ্বারা চিরকাল পর করে অসীম প্রেমের দ্বারা চিরকাল আপন করে নিচ্ছেন । এমন কত কোটি কোটি অন্তহীন আমির মধ্যে সেই এক পরম-আমির অনন্ত আনন্দ নিরন্তর ধবনিত তরঙ্গিত হয়ে উঠছে। অথচ এই অন্তহীন আমি-মণ্ডলীর প্রত্যেক আমির মধ্যেই তার এমন একটি বিশেষ রস বিশেষ প্রকাশ যা জগতে আর কোনোখানেই নেই। সেইজন্যে আমি যত ক্ষুদ্রই হই, আমার মতো তার আর দ্বিতীয় কিছুই নেই ; আমি যদি হারাই তবে লোকলোকান্তরের সমস্ত হিসােব গরমিল হয়ে যাবে। সেইজন্যেই