পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৬০৭

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


শান্তিনিকেতন (ቀbrd፧ বিশ্বব্ৰহ্মাণ্ডের আমাকে নইলে নয়, সেইজন্যেই সমস্ত জগতের ভগবান বিশেষরূপেই আমার ভগবান, সেইজন্যেই আমি আছি এবং অনন্ত প্রেমের বাধনে চিরকালই থাকব । আমির এই চরম গৌরবের কথাটি প্রতিদিন আমাদের মনে থাকে না । তাই প্রতিদিন আমরা ছোটাে হয়ে, সংসারী হয়ে, সম্প্রদায়বদ্ধ হয়ে থাকি । কিন্তু মানুষ আমির এই বড়ো দিকের কথাটি দিনের পর দিন, বৎসরের পর বৎসর ভুলে থেকে বাঁচবে কী করে । তাই প্ৰতিদিনের মধ্যে মধ্যে এক-একটি বড়োদিনের দরকার হয় । আগাগোড়া সমস্তই দেয়াল গেথে গৃহস্থ বঁাচে না, তার মাঝে মাঝে জানলা দরজা বসিয়ে সে বাহিরকে ঘরের ও ঘরকে বাহিরের করে রাখতে চায়। বড়োদিনগুলি হচ্ছে সেই প্রতিদিনের দেয়ালের মধ্যে বড়ো দরজা। আমাদের প্রতিদিনের সূত্রে এই বড়োদিনগুলি সূৰ্যকান্তমণির মতো গাথা হয়ে যাচ্ছে ; জীবনের মালায় এই দিনগুলি যত বেশি, যত খাটি, যত বড়ো, আমাদের জীবনের মূল্য তত বেশি, আমাদের জীবনে সংসারের শোভা তত বেড়ে ওঠে। তাই বলছিলুম, আজ আমাদের উৎসবের প্রাতে বিশ্বব্ৰহ্মাণ্ডের দিকে আশ্রমের দ্বার উদঘাটিত হয়ে গেছে ; আজ নিখিল মানবের সঙ্গে আমাদের যে-যোগ, সেই যোগটি ঘোষণা করবার রোশন'চৌকি এই প্ৰান্তরের আকাশ পূর্ণ করে বাজছে, কেবলই বাজছে, ভোর থেকে বাজছে । আজ আমাদের এই আশ্রমের ক্ষেত্ৰ সকলেরই আনন্দক্ষেত্র । কেন ? কেননা, আমাদের প্রত্যেকের জীবনের সাধনায় সমস্ত মানুষের সাধনা চলছে। এখানকার তপস্যায় সমস্ত পৃথিবীর লোকের ভাগ আছে। আশ্রমের সেই বড়ো কথাটিকে আজ আমাদের হৃদয়মনের মধ্যে আমাদের জীবনের সমস্ত সংকল্পের মধ্যে পরিপূর্ণ করে নেব । সকলের সঙ্গে আমাদের এই যোগের সংগীতটি আজ কে বাজাবেন । সেই মহাযোগী, জগতের অসংখ্য বীণাতন্ত্রী র্যার কোলের উপরে অনন্তকাল ধরে স্পন্দিত হচ্ছে । তিনিই একের সঙ্গে অন্যের, অন্তরের সঙ্গে মিলন ঘটিয়ে তুলছেন ; তারই হাতের সেই বিচ্ছেদমিলনের ঝংকারে বৈচিত্র্যের শত শত তান কেবলই উৎসারিত হয়ে আকাশ পরিপূর্ণ করে ছড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ছে ; একই ধুয়ো থেকে তানের পর তান ছুটে বেরিয়ে যাচ্ছে, এবং একই ধুয়োতে তানের পর তান এসে পরিসমাপ্ত হচ্ছে। বীণার তারগুলো যখন বাজে না তখন তারা পাশাপাশি পড়ে থাকে, তবুও তাদেৰু মিলন হয় না, তখনো তারা কেউ কাউকে আপনি বলে জানে না । যেই বেজে ওঠে অমনি সুরে সুরে তানে তানে তাদের মিলিয়ে দেয়- তাদের সমস্ত ফাকগুলো রাগরাগিণীর মাধুর্যে ভরে ভরে ওঠে। তখন তারা স্বতন্ত্র তবু এককেউ বা লোহার কেউ-বা পিতলের, তবু এক- কেউ বা সরু সুরের কেউ-বা মোটা সুরের, তবু একতখন তারা কেউ কাউকে আর ছাড়তে পারে না । তাদের প্রত্যেকের ভিতরের সত্য বাণীটি যেই প্ৰকাশ হয়ে যায়— দেখা যায় আপনার মধ্যে সূর যতই স্বতন্ত্র হােক, গানের মধ্যে তারা এক । আমাদের জীবনের বীণাতে, সংসারের বীণাতে প্রতিদিন তার বাধা চলছে, সুর বাধা এগোচ্ছে। সেই বাধিবার মুখে কত কঠিন আঘাত, কত তীব্র বেসুর । তখন চেষ্টার মূর্তি, কষ্ট্রের মূর্তিটাই বার বার করে দেখা যায় । সেই বেসুরকে সমগ্রের সুরে মিলিয়ে তুলতে এত টান পড়ে যে, এক-এক সময় মনে হয় যেন তার আর সইতে পারল না, গেল বুঝি ছিড়ে । এমনি করে চেয়ে দেখতে দেখতে শেষকালে মনে হয়, তবে বুঝি সার্থকতা কোথাও নেই- কেবলই বুঝি এই টানাটানি বাধািৰ্বাধি, দিনের পর দিন কেবলই খেটে মরা, কেবলই ওঠা পড়া, কেবলই অহংযন্ত্রটার অচল খোটার মধ্যে বাধা থেকে মোচড় খাওয়া- কোনো অর্থ নেই, কোনো পরিণাম নেই- কেবলই দিনযাপন মাত্র । কিন্তু যিনি আমাদের বাজিয়ে তিনি কেবলই কি কঠিন হাতে নিয়মের খোটায় চড়িয়ে পাক দিয়ে দিয়ে আমাদের সুরই বঁাধছেন । তা তো নয় । সঙ্গে সঙ্গে মুহুর্তে মুহুর্তে ঝংকারও দিচ্ছেন । কেবলই নিয়ম ? তা তো নয় । তার সঙ্গে সঙ্গেই আনন্দ । প্রতিদিন খেতে হচ্ছে বটে পেটের দায়ের অত্যন্ত কঠোর নিয়মে, কিন্তু তার সঙ্গে সঙ্গেই মধুর স্বাদটুকুর রাগিণী রসনায় রসিত হয়ে উঠছে। আত্মরক্ষার বিষম চেষ্টায় প্রত্যেক