পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৬১১

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


শান্তিনিকেতন (?bry কবির মুক্ত আনন্দ আপনাকে প্রকাশ করবার বেলায় ছন্দের বাধন মানে । কিন্তু, যে লোকের নিজের মনের মধ্যে ভাবের উদবোধন হয় নি সে বলে, এর মধ্যে আগাগোড়া কেবল ছন্দের ব্যায়ামই দেখছি। সে নিয়ম দেখে, নৈপুণ্য দেখে, কেননা সেইটেই চোখে দেখা যায় ; কিন্তু যাকে অন্তর দিয়ে দেখা যায়। সেই রসকে সে বোঝে না, সে বলে রস কিছুই নেই। সে মাথা নেড়ে বলছে, সমস্তই যন্ত্র, কেবল বৈজ্ঞানিক निशभ । কিন্তু, ঐ-যে কার উচ্ছসিত কণ্ঠ এমন নিতান্ত সহজ সুরে বলে উঠেছে ; রিসো বৈ সঃ । কবির কাব্যে তিনি যে অনন্ত রস দেখতে পাচ্ছেন । জগতের নিয়ম তো তার কাছে আপনার বন্ধনের রূপ দেখাচ্ছে না । তিনি যে একেবারে নিয়মের চরমকে দেখে আনন্দে বলে উঠেছেন : আনন্দাদ্ধ্যোব খঘিমানি ভূতানি জায়ন্তে । জগতে তিনি ভয়কে দেখছেন না, আনন্দকেই দেখছেন। সেইজন্যেই বলছেন : আনন্দং ব্ৰহ্মণো বিদ্বানন বিভৌতি কুতশচন । ব্রহ্মের আনন্দকে যিনি সর্বত্র জানতে পেরেছেন তিনি আর কিছুতেই ভয় পান না। এমনি করে জগতে আনন্দকে দেখে প্রত্যক্ষ ভয়কে যিনি একেবারেই অস্বীকার করেছেন তিনিই বলেছেন : মহদ ভয়ং বাজমুদ্যতং য এতৎ বিদুর মৃতন্তে ভবান্তি । এই মহদভয়কে, এই উদ্যত বীজকে যারা জানেন র্তাদের আর মৃত্যুভয় থাকে না । যারা জেনেছে, ভয়ের মধ্য দিয়েই অভয়, নিয়মের মধ্য দিয়েই আনন্দ আপনাকে প্ৰকাশ করেন, তারাই নিয়মকে পার হয়ে চলে গেছে । নিয়মের বন্ধন তাদের পক্ষে নেই যে তা নয়, কিন্তু সে যে আনন্দেরই বন্ধন, সে যে প্রেমিকের পক্ষে প্রিয়তমের ভুজিবন্ধনের মতো । তাতে দুঃখ নেই, কোনো দুঃখ নেই। সকল বন্ধনই সে যে খুশি হয়ে গ্ৰহণ করে, কোনোটাকেই এড়াতে চায় না। কেননা, সমস্ত বন্ধনের মধ্যেই সে যে আনন্দের নিবিড় স্পর্শ উপলব্ধি করতে থাকে। বস্তুত যেখানে নিয়ম নেই, যেখানে উচ্ছঙ্খল উন্মত্ততা, সেইখানেই তাকে বাধে, তাকে মারে- সেইখানেই অসীমের সঙ্গে বিচ্ছেদ, পাপের যন্ত্রণা। প্রবৃত্তির আকর্ষণে সত্যের সুদৃঢ় নিয়মবন্ধন থেকে যখন সে স্বলিত হয়ে পড়ে তখনই সে মাতার আলিঙ্গনস্ৰষ্ট শিশুর মতো কেঁদে উঠে বলে ; মা মা হিংসীঃ । আমাকে আঘাত কোরো না । সে বলে, বাধো, আমাকে বাধো, তোমার নিয়মে আমাকে বাধো, অন্তরে বাধো, বাহিরে বাধো— আমাকে আচ্ছন্ন করে, আবৃত করে বেঁধে রাখে ; কোথাও কিছু ফাক রেখো না, শক্ত করে ধরে ; তোমারই নিয়মের বাহুপাশে বাধা পড়ে তোমার আনন্দের সঙ্গে জড়িত হয়ে থাকি । আমাকে পাপের মৃত্যুবন্ধন থেকে টেনে নিয়ে তুমি দৃঢ় করে রক্ষা করো। নিয়মকে আনন্দের বিপরীত জ্ঞান করে কেউ কেউ যেমন মাতলামিকেই আনন্দ বলে ভুল করে তেমনি আমাদের দেশে এমন লোক প্রায় দেখা যায় যারা কর্মকে মুক্তির বিপরীত বলে কল্পনা করেন । তারা মনে করেন কর্ম পদার্থটা স্কুল, ওটা আত্মার পক্ষে বন্ধন । কিন্তু, এই কথা মনে রাখতে হবে, নিয়মেই যেমন আনন্দের প্রকাশ কর্মেই তেমনি আত্মার মুক্তি । আপনার ভিতরেই আপনার প্রকাশ হতে পারে না বলেই আনন্দ বাহিরের নিয়মকে ইচ্ছা করে, তেমনি আপনার ভিতরেই আপনার মুক্তি হতে পারে না বলেই আত্মা মুক্তির জন্যে বাহিরের কর্মকে চায়। মানুষের আত্মা কর্মেই আপনার ভিতর থেকে আপনাকে মুক্ত করছে ; তাই যদি না হত তা হলে কখনোই, সে ইচ্ছা! করে কর্ম করত না | মানুষ যতই কর্ম করছে ততই সে আপনার ভিতরকার অদৃশ্যকে দৃশ্য করে তুলছে, ততই সে আপনার সুদূরবতী অনাগতকে এগিয়ে নিয়ে আসছে। এই উপায়ে মানুষ আপনাকে কেবলই স্পষ্ট করে তুলছেমানুষ আপনার নানা কর্মের মধ্যে, রাষ্ট্রের মধ্যে, সমাজের মধ্যে আপনাকেই নানা দিক থেকে দেখতে পাচ্ছে । এই দেখতে পাওয়াই মুক্তি । অন্ধকার মুক্তি নয়, অস্পষ্টতা মুক্তি নয়। অস্পষ্টতার মতো ভয়ংকর বন্ধন নেই। অস্পষ্টতাকে ভেদ করে উঠবার জন্যেই বীজের মধ্যে অকুরের চেষ্টা, কুঁড়ির মধ্যে ফুলের প্রয়াস । অস্পষ্টতার আবরণকে ভেদ করে সুপরিস্ফুট হবার জন্যেই আমাদের চিত্তের ভিতরকার ভােবরাশি বাইরে আকারগ্রহণের উপলক্ষ খুঁজে বেড়াচ্ছে। আমাদের আত্মাও অনির্দিষ্টতার কুহেলিকা থেকে আপনাকে মুক্ত করে বাইরে আনবার জন্যেই কেবলই কর্ম সৃষ্টি করছে। যে কর্মে তার কোনো প্রয়োজনই নেই, যা তার