পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৬২২

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


VO C. রবীন্দ্র-রচনাবলী “একং রূপং বহুধা যঃ করোতি' যিনি একরূপকে বিশ্বজগতে বহুধা করে প্রকাশ করেছেন, “তম আত্মস্থং যে অনুপশ্যন্তি ধীরাঃ তাকে যে ধীরেরা আত্মস্থ করে দেখেন, অর্থাৎ ধারা তাকে আপনার একের মধ্যে এক করে দেখেন, “তেষাং সুখং শাশ্বতং নেতরেযাম, তাদেরই সুখ নিত্য, আর-কারও না । আত্মার সঙ্গে এই পরমাত্মাকে দেখা এ অত্যন্ত একটি সহজ দৃষ্টি, এ একেবারেই যুক্তিতর্কের দৃষ্টি নয়। এ হচ্ছে “দিবীব চক্ষুরাততং । চক্ষু যেমন একেবারে সহজেই আকাশে বিত্তীর্ণ পদার্থকে দেখতে পায় এ সেইরকম দেখা । আমাদের চক্ষুর স্বভাবই হচ্ছে সে কোনো জিনিসকে ভেঙে ভেঙে দেখে না, একেবারে সমগ্র করে দেখে। সে স্পেকট্রস্কোপ যন্ত্র দিয়ে দেখার মতো করে দেখে না, সে আপনার মধ্যে সমস্তকে বেঁধে নিয়ে আপন করে দেখতে জানে। আমাদের আত্মবোধের দৃষ্টি যখন খুলে যায়। তখন সেও তেমনি অত্যন্ত সহজেই আপনাকে এক করে এবং পরম একের সঙ্গে আনন্দে সম্মিলিত করে দেখতে পায় । সেইরকম করে সমগ্র করে দেখাই তার সহজ ধর্ম। তিনি যে পরম আত্মা, আমাদের পরম-আপনি । সেই পরম-আপনিকে যদি আপন করেই না জানা যায়, তা হলে আর যেমন করেই জানা যাক তাকে জানাই হল না । জ্ঞানে জানাকে আপন করে জানা বলে না, ঠিক উলটাে- জ্ঞান সহজেই তফাত করে জানে, আপন করে জানিবার শক্তি তার হাতে নেই । উপনিষৎ বলছেন- “এষ দেবো বিশ্বকর্ম’, এই দেবতা বিশ্বকৰ্মা, বিশ্বের অসংখ্য কমে আপনাকে অসংখ্য আকারে ব্যক্ত করছেন, কিন্তু তিনিই ‘মহাত্মা সদা জনানাং হৃদয় সন্নিবিষ্টঃ’, মহান-আপন-রূপে পরম-এক-রূপে সর্বদাই মানুষের হৃদয়ের মধ্যে সন্নিবিষ্ট আছেন। “হৃদ মনীষা মনসাভিক,৯প্তো। যা এতৎসেই হৃদয়ের যে জ্ঞান, যে জ্ঞান একেবারে সংশয়ারহিত অব্যবহিত জ্ঞান, সেই জ্ঞানে র্যারা ঐকে পেয়ে থাকেন। ‘অমৃতাস্তে ভবন্তি, তারাই অমৃত হন। আমাদের চোখ। যেমন একেবারে দেখে আমাদের হৃদয় তেমনি স্বভাবত একেবারে অনুভব করেমধুরকে তার মিষ্ট লাগে, রুদ্রকে তার ভীষণ বোধ হয়, সেই বোধের জন্যে তাকে কিছুই চিন্তা করতে হয় না । সেই আমাদের হৃদয় যখন তার স্বাভাবিক সংশয়ারহিত বোধশক্তির দ্বারাই পরম এককে বিশ্বের মধ্যে এবং আপনার মধ্যে প্রত্যক্ষ অনুভব করে তখন মানুষ চিরকালের জন্যে বেঁচে যায়। জোড়া দিয়ে দিয়ে অনন্ত কালেও আমরা এককে পেতে পারি নে, হৃদয়ের সহজ বোধে এক মুহুর্তেই তাকে একান্ত আপন করে পাওয়া যায় । তাই উপনিষৎ বলেছেন তিনি আমাদের হৃদয়ে সন্নিবিষ্ট, তাই একেবারেই রসরাপে আনন্দরূপে তাকে অব্যবহিত করে পাই, আর কিছুতে পাবার জো নেই যতো বাচো নিবর্তন্তে অপ্ৰাপ্য মনসা সহ আনন্দং ব্ৰহ্মণো বিদ্ধান ন বিভৌতি কুতশচন । বাক্যমন র্যাকে না পেয়ে ফিরে আসে সেই ব্ৰহ্মের আনন্দকে হৃদয় যখন বোধ করে তখন আর-কিছুতেই ভয় Q6द5 क्रा | এই সহজ বোধটি হচ্ছে প্রকাশ- এ জােনা নয়, সংগ্রহ করা নয়, জোড়া দেওয়া নয়, আলো যেমন একেবারে প্রকাশ হয় এ তেমনি প্রকাশ। প্রভাত যখন হয়েছে তখন আলোর খোজে হাটে বাজারে ছুটতে হবে না, জ্ঞানীর দ্বারে ঘা মারতে হবে না- যা-কিছু বাধা আছে সেইগুলো কেবল মোচন করতে হবেদরজা খুলে দিতে হবে, তা হলেই আলো একেবারে অখণ্ড হয়ে প্রকাশ পাবে। সেইজন্যেই এই প্রার্থনাই মানুষের গভীরতম প্রার্থনা : আবিরাবীর্ম এধি। হে আবিঃ, হে প্ৰকাশ, তুমি আমার মধ্যে প্রকাশিত হও । মানুষের যা দুঃখ সে অপ্রকাশের দুঃখ- যিনি প্রকাশস্বরূপ তিনি এখনো তার মধ্যে ব্যক্ত হচ্ছেন না ; তার হৃদয়ের উপর অনেকগুলো আবরণ রয়ে গেছে ; এখনো তার মধ্যে বাধা-বিরোধের সীমা নেই ; এখনো সে আপনার প্রকৃতির নানা অংশের মধ্যে পরিপূর্ণ সামঞ্জস্য স্থাপন করতে পারছে না ; এখনো তার এক ভাগ অন্য ভাগের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করছে, তার স্বার্থের সঙ্গে পরমার্থের মিল হচ্ছে না, এই উচ্ছঙ্খলতার মধ্যে যিনি আবিঃ তীর আবির্ভাব পরিস্ফুট হয়ে উঠছে না ; ভয় দুঃখ শোক অবসান অকৃতাৰ্থতা এসে পড়ছে- যা গিয়েছে তার জন্যে বেদনা, যা আসবে তার জন্য ভাবনা চিত্তকে মথিত করছে- আপনার অন্তর বাহির সমস্তকে নিয়ে জীবন প্রসন্ন হয়ে উঠছে না। এইজন্যেই মানুষের