পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৬২৫

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


শান্তিনিকেতন \9O\O এইজন্যই আমাদের দেশে ভক্তের গীেরব এমন করে কীর্তন করেছে যা অন্য দেশে উচ্চারণ করতে লোকে সংকোচ বোধ করে । যিনি আনন্দময়, আপনাকে যিনি প্ৰকাশ করেন, সেই প্রকাশে যার আনন্দ, তিনি তার সেই আনন্দকে বিশুদ্ধ আনন্দরূপে প্ৰকাশ করেন। ভক্তের জীবনে । এই প্রকাশের জন্যে তাকে ভক্তের ইচ্ছার অপেক্ষা করতে হয় ; এখানে জোর খাটে না। রাজার পেয়াদা প্রেমের রাজ্যে পা বাড়াতে পারে না । প্রেম ছাড়া প্রেমের গতি নেই। এইজন্যে ভক্ত যে দিন। আপনার অহংকারকে বিসর্জন দেয়, ইচ্ছা করে আপনার ইচ্ছাকে তঁর ইচ্ছার সঙ্গে মিলিয়ে দেয়, সেই দিন মানুষের মধ্যে তাঁর আনন্দের প্রকাশ সম্পূর্ণ হয়। সেই প্ৰকাশ তিনি চাচ্ছেন। সেইজন্যেই মানুষের হৃদয়ের দ্বারে নিত্য নিত্যই তার সৌন্দর্যের লিপি এসে পীেচচ্ছে, তার রসের আঘাত কত রকম করে আমাদের চিত্তে এসে পড়ছে- এবং ঘুম থেকে আমাদের সমস্ত প্ৰকৃতিকে জাগিয়ে তোেলবার জন্যে বিপদ মৃত্যু দুঃখ শোক ক্ষণে ক্ষণে নাড়া দিয়ে যাচ্ছে। সেই প্ৰকাশ তিনি চাচ্ছেন, সেইজন্যেই আমাদের চিত্তও সকল বিস্মৃতি সকল অসাড়তার মধ্যেও গভীরতর ভাবে সেই প্ৰকাশকে চাচ্ছে । বলছে : আবিরাবীর্ম এধি । আমাদের দেশের ভক্তিশাস্ত্রের এই স্পর্ধার কথা, অর্থাৎ অনিম্ভের ইচ্ছা আমাদের ইচ্ছার দ্বারে এসে দাড়িয়েছে এই কথা, আজকাল অন্য দেশের অন্য ভাষাতেও আভাস দিচ্ছে। সেদিন একজন ইংরেজ ভক্ত কবির কবিতায় এই কথাই দেখলুম। তিনি ভগবানকে ডেকে বলছেন— Thou hast need ofthy meanest creature ; thou hast need of what once was thine : The thirst that consumes my spirit is the thirst of thy heart for mine. তিনি বলছেন : তোমার দীনতম জীবটিকেও তোমার প্রয়োজন আছে ; সে যে একদিন তোমাতেই ছিল, আবার তুমি তাকে তোমারই করে নিতে চাও ; আমার চিত্তকে যে তৃষায় দগ্ধ করছে সে যে তোমারই তৃষা, আমার জন্যে তোমার হৃদয়ের তৃষা । পশ্চিম হিন্দুস্থানের পুরাকালের এক সাধক কবি, তার নাম জ্ঞানদাস বঘৈলি- তিনিও ঠিক এই কথাই বলেছেন । আমার এক বন্ধু তার বাংলা অনুবাদ করেছেনঅসীম ক্ষুধায় অসীম তৃষায় বহ প্ৰভু অসীম ভাষায়, তাই, দীননাথ, আমি ক্ষুধিত আমি তৃষিত্ব তাই তো আমি দীন । আমার জন্যে তারই যে তৃষা তাই তার জন্যে আমার তৃষার মধ্যে প্রকাশ পাচ্ছে। তার অসীম তৃষাকে তিনি অসীম ভাষায় প্রকাশ করছেন । সেই ভাষাই তো উষার আলোকে, নিশীথের নক্ষত্রে, বসন্তের সৌরভো, শরতের স্বর্ণীকরণে । জগতে এই ভাষার তো আর কোনোই কাজ নেই, সে তো কেবলই হৃদয়ের প্রতি হৃদয়মহাসমুদ্রের ডাক । সে কবি বলরামদাসের ভাষায় বলছে : তোমায় হিয়ার ভিতর হৈতে কে কৈল বাহির ! তুমি আমার হৃদয়ের ভিতরেই ছিলে, কিন্তু বিচ্ছেদ হয়েছে ; সেই বিচ্ছেদ মিটিয়ে আবার ফিরে এসো, সমস্ত দুঃখের পথটা মাড়িয়ে আবার আমাতে ফিরে এসো, হৃদয়ের সঙ্গে হৃদয়ের মিলন সম্পূর্ণ হােক - এই একটি বিরহবেদনা অনন্তের মধ্যে রয়েছে, সেইজন্যেই আমার মধ্যেও আছে। I have come from thee, why I know not ; but thou art, O God what thou art; And the round of eternal being is the pulse of thy beating heart. আমি তোমার মধ্য থেকে এসেছি কেন যে তা জানি নে, কিন্তু হে ঈশ্বর, তুমি যেমন তেমনিই আছ ; এই—যে একবার তোমা থেকে বেরিয়ে আবার যুগ-যুগান্তের মধ্য দিয়ে তোমাতেই ফিরে আসা, এই হচ্ছে তোমার অসীম হািদয়ের এক-একটি হৃৎস্পন্দন ।