পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৬৩০

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


VOr রবীন্দ্র-রচনাবলী করে দিয়েছে। তা যদি না করত, তা হলে সে আত্মরক্ষা করতেই পারত না । মুসলমানধর্ম প্ৰবল ধর্ম, এবং তা নিশ্চেষ্ট ধর্ম নয়। এই ধর্ম যেখানে গেছে সেখানেই আপনার বিরুদ্ধ ধর্মকে আঘাত করে ভূমিসাৎ করে তবে ক্ষান্ত হয়েছে। ভারতবর্ষের উপরেও এই প্রচণ্ড আঘাত এসে পড়েছিল এবং বহু শতাব্দী ধরে এই আঘাত নিরন্তর কাজ করেছে। এই আঘাতবেগ যখন অত্যন্ত প্ৰবল, তখনকার ধর্ম ইতিহাস আমরা দেখতে পাই নে । কারণ, সে ইতিহাস সংকলিত ও লিপিবদ্ধ হয় নি। কিন্তু, সেই মুসলমান অভ্যাগমের যুগে ভারতবর্ষে যে-সকল সাধক জাগ্রত হয়ে উঠেছিলেন তাদের বাণী আলোচনা করে দেখলে স্পষ্ট দেখা যায়। ভারতবর্ষ আপন অন্তরতম সত্যকে উদঘাটিত করে দিয়ে এই মুসলমানধর্মের আঘাতবেগকে সহজেই গ্রহণ করতে পেরেছিল। সত্যের আঘাত কেবল সত্যই গ্রহণ করতে পারে। এইজন্য প্রবল আঘাতের মুখে প্ৰত্যেক জাতি হয় আপনার শ্রেষ্ঠ সত্যকে সমুজ্জ্বল করে প্রকাশ করে, নয় আপনার মিথ্যা সম্বলকে উড়িয়ে দিয়ে দেউলে হয়ে যায় । ভারতবর্ষেরও যখন আত্মরক্ষার দিন উপস্থিত হয়েছিল তখন সাধকের পর সাধক এসে ভারতবর্ষের চিরসত্যকে প্রকাশ করে ধরেছিলেন । সেই যুগের নানক রবিদাস কবীর দাদু প্রভৃতি সাধুদের জীবন ও রচনা র্যারা আলোচনা করছেন তারা সেই সময়কার ধর্ম ইতিহাসের যবনিকা অপসারিত করে যখন দেখাবেন তখন দেখতে পাব ভারতবর্ষ তখন আত্মসম্পদ সম্বন্ধে কিরকম সবলে সচেতন হয়ে উঠেছিল । ভারতবর্ষ তখন দেখিয়েছিল, মুসলমানধর্মের যেটি সত্য সেটি ভারতবর্ষের সত্যের বিরোধী নয় । দেখিয়েছিল, ভারতবর্ষের মর্মস্থলে সত্যের এমন একটি বিপুল সাধনা সঞ্চিত হয়ে আছে যা সকল সত্যকে আত্মীয় বলে গ্রহণ করতে পারে। এইজন্যেই সত্যের আঘাত তাঁর বাইরে এসে যতই ঠোকুক তার মর্মে গিয়ে কখনো বাজে না, তাকে বিনাশ করে না । আজ আবার পাশ্চাত্যজগতের সত্য আপনার জয়ঘোষণা করে ভারতবর্ষের দুৰ্গদ্বারে আঘাত করেছে। এই আঘাত কি আত্নীয়ের আঘাত হবে না। শত্রুর আঘাত হবে ? প্রথম যেদিন সে শৃঙ্খলধ্বনি করে এসেছিল সেদিন তো মনে করেছিলুম। সে বুঝি মৃত্যুবাণ হানবে । আমাদের মধ্যে যারা ভীরু তারা মনে করেছিল ভারতবর্ষের সত্যসম্বল নেই, অতএব এইবার তাকে তাঁর জীৰ্ণ আশ্রয় পরিত্যাগ করতে হল বুঝি । কিন্তু, তা হয় নি । পৃথিবীর নব আগন্তুকের সাড়া পেয়ে ভারতবর্ষের নবীন সাধকেরা নিৰ্ভয়ে তার বহু দিনের অবরুদ্ধ দুর্গের দ্বার খুলে দিলেন । ভারতবর্ষের সাধনভাণ্ডারে এবার পাশ্চাত্য অতিথিকে সমাদরে আহবান করা হয়েছে- ভয় নেই, কোনো অভাব নেই- এইবার যে ভোজ হবে সেই আনন্দভোজে পূর্ব পশ্চিম এক পঙক্তিতে বসে যাবে। ভারতবর্ষের সেই চিরন্তন সাধনার দ্বার উদঘাটনই ব্ৰাহ্মসমাজের ঐতিহাসিক তাৎপর্য। অনেক দিন দ্বার রুদ্ধ ছিল, তালায় মর্চে পড়েছিল, চাবি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না । এইজন্যে গোড়ায় খোলবার সময় কঠিন ধাক্কা দিতে হয়েছে, সেটাকে যেন বিরোধের মতো বোধ হয়েছিল । কিন্তু, বিরোধ নয় । বর্তমানকালের সংঘর্ষে ব্ৰাহ্মসমাজে। ভারতবর্ষ আপনার সত্যরূপ প্ৰকাশের জন্য প্ৰস্তুত হয়েছে। চিরকালের ভারতবর্ষকে ব্ৰাহ্মসমাজ নবীনকালের বিশ্বপুথিবীর সভায় আহবান করেছে। বিশ্বপূথিবীর পক্ষে এখনো এই ভারতবর্ষকে প্রয়োজন আছে। বিশ্বমানবের উত্তরোত্তর উদ্ভিদ্যমান সমস্ত বৈচিত্রোর মধ্যে বর্তমান যুগে ভারতবর্ষের সাধনাই সকল সমস্যার সকল জটিলতার যথার্থ সমাধান করে দেবে- এই একটা আশা ও আকাঙক্ষা বিশ্বমানবের বিচিত্ৰকণ্ঠে আজ ফুটে উঠছে। ব্ৰাহ্মসমাজকে, তার সাম্প্রদায়িকতার আবরণ ঘুচিয়ে দিয়ে, মানব-ইতিহাসের এই বিরাট ক্ষেত্রে বৃহৎ করে উপলব্ধি করবার দিন আজ উপস্থিত হয়েছে। আমরা ব্ৰহ্মাকে স্বীকার করেছি। এই কথাটি যদি সত্য হয় তবে আমরা ভারতবর্ষকে স্বীকার করেছি এবং ভারতবর্ষের সাধনক্ষেত্রে সমুদয় পৃথিবীর সত্যসাধনাকে গ্রহণ করবার মহাযজ্ঞ আমরা আরম্ভ করেছি । ব্ৰহ্মের উপলব্ধি বলতে যে কী বোঝায় উপনিষদের একটি মন্ত্রে তার আভাস আছেযো দেবোহন্ত্রেী যোহপসু যো বিশ্বং ভুবনমাবিবেশ