পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৬৩১

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


শান্তিনিকেতন VOS য ওষধীয়ু যো বনস্পতিযু তস্মৈ দেবায় নমোনমঃ । যে দেবতা অগ্নিতে, যিনি জলে, যিনি নিখিল ভুবনে প্ৰবেশ করে আছেন, যিনি ওষধিতে, যিনি বনস্পতিতে, সেই দেবতাকে বার বার নমস্কার করি । ঈশ্বর সর্বব্যাপী এই মোটা কথাটা বলে নিস্কৃতি পাওয়া নয়। এটি কেবল জ্ঞানের কথামাত্র নয় ; এ একটি পরিপূর্ণ বোধের কথা । অগ্নি জল তরুলতাকে আমরা ব্যবহারের সামগ্ৰী বলেই জানি, এইজন্য আমাদের চিত্ত তাদের নিতান্ত আংশিক ভাবেই গ্রহণ করে ; আমাদের চৈতন্য সেখানে পরমচৈতন্যকে অনুভব করে না । উপনিষদের উল্লিখিত মন্ত্রে আমাদের সমস্ত চেতনাকে সেই বিশ্বব্যাপী চৈতন্যের মধ্যে আহবান করছে। জড়ে জীবে নিখিল ভুবনে ব্ৰহ্মকে এই-যে উপলব্ধি করা এ কেবলমাত্র জ্ঞানের উপলব্ধি নয়, এ ভক্তির উপলব্ধি । ব্ৰহ্মাকে সর্বত্র জানা নয়- সর্বত্র নমস্কার করা, বোধের সঙ্গে সঙ্গে নমস্কারকে বিশ্বভুবনে প্রসারিত করে দেওয়া । ভূমাকে যেখানে আমরা বোধ করি সেই বোধের রসই হচ্ছে ভক্তি । বিশ্বব্ৰহ্মাণ্ডের কোথাও এই রসের বিচ্ছেদ না রাখা, সমস্তকে ভক্তির দ্বারা চৈতনের মধ্যে উপলব্ধি করা, জীবনের এমন পরিপূর্ণতা জগদাবাসের এমন সার্থকতা আর কী হতে পারে ! কালের বহুতর আবর্জনার মধ্যে এই ব্ৰহ্মসাধনা একদিন আমাদের দেশে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল । সে জিনিস তো একেবারে হারিয়ে যাবার নয় । তাকে আমাদের খুঁজে পেতেই হবে । কেননা, এইব্রহ্মসাধনা থেকে বাদ দিয়ে দেখলে মনুষ্যত্বের কোনো একটা চরম তাৎপর্য থাকে না, সে একটা পুনঃপুনঃ আবর্তমান অস্তহীন ঘূর্ণর মতো প্রতিভাত হয় । ভারতবর্ষ যে সত্যসম্পদ পেয়েছিল মাঝে তাকে হারাতে হয়েছে। কারণ পুনর্বাের তাকে বৃহত্তর করে পূর্ণতর করে পাবার প্রয়োজন আছে। হারাবার কারণের মধ্যে নিশ্চয়ই একটা অপূর্ণতা ছিল ; সেইটিকে শোধন করে নেবার জন্যেই তাকে হারাতে হয়েছে। একবার তার কাছে থেকে দূরে না গেলে তাকে বিশুদ্ধ করে সত্যা করে দেখবার অবকাশ পাওয়া যায় না । হারিয়েছিলুম কেন । আমাদের সাধনার মধ্যে একটা অসামঞ্জস্য ঘটেছিল । আমাদের সাধনার মধ্যে অন্তর ও বাহির, আত্মার দিক ও বিষয়ের দিক, সমান ওজন রেখে চলতে পারে নি । আমরা ব্ৰহ্মসাধনায় যখন জ্ঞানের দিকে বেঁক দিয়েছিলুম। তখন জ্ঞানকেই একান্ত করে তুলেছিলুম ; তখন জ্ঞান যেন জ্ঞানের সমস্ত বিষয়কে পর্যন্ত একেবারে পরিহার করে কেবল আপনার মধ্যেই আপনাকে পর্যাপ্ত করে তুলতে চেয়েছিল । আমাদের সাধনা যখন ভক্তির পথ অবলম্বন করেছিল ভক্তি তখন বিচিত্র কর্মে ও সেবায় আপনাকে প্রবাহিত করে না দিয়ে নিজের মধ্যেই নিজে ক্রমাগত উচ্ছসিত হয়ে একটা ফেনিল ভাবোন্মত্ততার আবর্ত সৃষ্টি করেছে । যে জিনিস জড় নয়। সে কেবলমাত্র আপনাকে নিয়ে টিকতে পারে না, আপনার বাইরে তাকে আপনার খাদ্য খুঁজতে হয়। জীব যখন খাদ্যাভাবে নিজের চর্বি ও শারীর উপকরণকে নিজে ভিতরে ভিতরে খেতে থাকে তখন সে কিছুদিন বেঁচে থাকে, কিন্তু ক্রমশই নীরস ও নিজীব হয়ে মারা পড়ে । আমাদের জ্ঞানবৃত্তি হৃদয়বৃত্তিও কেবল আপনাকে আপনি খেয়ে বাঁচতে পারে না— আপনাকে পোষণ করবার জন্যে, রক্ষা করবার জন্যে, আপনার বাইরে তাকে যেতেই হবে । কিন্তু, ভারতবর্ষে একদিন জ্ঞান অত্যন্ত বিশুদ্ধ অবস্থা পাবার প্রলোভনে সমস্তকে বর্জন করে নিজের কেন্দ্রের মধ্যে নিজের পরিধিকে বিলুপ্ত করবার চেষ্টা করেছিল এবং হৃদয় আপনার হৃদয়বৃত্তিতে নিজের মধ্যেই নিজের লক্ষ্য স্থাপন করে আপনাকে ব্যৰ্থ করে তুলেছিল । পৃথিবীর পশ্চিম প্রদেশ তখন এর উলটাে দিকে চলছিল। সে বিষয়রাজ্যের বৈচিত্র্যের মধ্যে অহরহ ঘুরে ঘুরে বহুতর তথ্য সংগ্রহ করে সেগুলিকে স্তুপাকার করে তুলছিল-- তার কোনো অন্ত ছিল না, কোনো ঐক্য ছিল না । তার ছিল কেবল সংগ্রহের লোভেই সংগ্ৰহ, কাজের উত্তেজনাতেই কাজ, ভোগের মত্ততাতেই (Ne? কিন্তু এই বিষয়ের বৈচিত্র্য-রাজ্যে যুরোপ গভীরতম চরম ঐক্যটি পায় নি বটে, তবু তার সর্বব্যাপী একটি