পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৬৩২

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


VSO রবীন্দ্র-রচনাবলী বাহ্য শৃঙ্খলা সে দেখেছিল। সে দেখেছে সমস্তই অমোঘ নিয়মের শৃঙ্খলে পরস্পর অবিচ্ছিন্ন বঁাধা । কোথায় বাধা, কার হাতে বাধা- এইসমস্ত বন্ধন কোনখানে একটি মুক্তিতে একটি আনন্দে পর্যবসিত যুরোপ তা দেখে নি । , এমন সময়েই রামমোহন রায় আমাদের দেশের প্রাচীন ব্ৰহ্মসাধনাকে নবীন যুগে উদঘাটিত করে দিলেন । ব্ৰহ্মকে তিনি নিজের জীবনের মধ্যে গ্ৰহণ করে জীবনের সমস্ত শক্তিকে বৃহৎ করে বিশ্বব্যাপী করে প্রকাশ করে দিলেন । তার সকল চিন্তা সকল চেষ্টা, মানুষের প্রতি তার প্ৰেম, দেশের প্রতি তার শ্রদ্ধা, কল্যাণের প্রতি তার লক্ষ, সমস্তই ব্ৰহ্মসাধনাকে আশ্রয় করে উদার ঐক্য লাভ করেছিল । ব্ৰহ্মকে তিনি জীবন থেকে এবং ব্ৰহ্মাণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন করে কেবলমাত্র ধ্যানের বস্তু জ্ঞানের বস্তু করে নিভৃতে নির্বাসিত করে রাখেন নি । ব্ৰহ্মকে তিনি বিশ্ব-ইতিহাসে বিশ্বধর্মে বিশ্বকৰ্মে সর্বত্রই সত্য করে দেখবার সাধনা নিজের জীবনে এমন করে প্ৰকাশ করলেন যে সেই তার সাধনার দ্বারা আমাদের দেশে সকল বিষয়েই তিনি নুতন যুগের প্রবর্তন করে দিলেন । রামমোহন রায়ের মুখ দিয়ে ভারতবর্ষ আপনি সত্যবাণী ঘোষণা করেছে। বিদেশের গুরু যখন এই ভারতবর্ষকে দীক্ষা দেবার জন্য উপস্থিত হয়েছিল। এই বাণী তখনই উচ্চারিত হয়েছে । অথচ আশ্চর্যের বিষয় এই যে, ঘরে বাহিরে তখন এই ব্ৰহ্মসাধনার কথা চাপা ছিল । আমাদের দেশে তখন ব্ৰহ্মকে পরমজ্ঞানীর অতিদূর গহন জ্ঞানদুর্গের মধ্যে কারারুদ্ধ করে রেখেছিল ; চারি দিকে রাজত্ব করছিল আচার বিচার বাহ্য-অনুষ্ঠান এবং ভক্তিরসমাদকতার বিচিত্র আয়োজন । সেদিন রামমোহন রায় যখন ব্ৰহ্মসাধনকে পুঁথির অন্ধকার-সমাধি থেকে মুক্ত করে জীবনের ক্ষেত্রে এনে দাড় করালেন তখন দেশের লোক সবাই ক্রুদ্ধ হয়ে বলে উঠল ; এ আমাদের আপনি জিনিস নয়, এ আমাদের বাপ-পিতামহের সামগ্ৰী নয়। বলে উঠল এ খৃস্টানি, একে ঘরে ঢুকতে দেওয়া হবে না। শক্তি যখন বিলুপ্ত হয়, জীবন যখন সংকীর্ণ হয়ে আসে, জ্ঞান যখন গ্ৰাম্যগাণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ হয়ে কাল্পনিকতাকে নিয়ে যথেচ্ছবিশ্বাসের অন্ধকার ঘরে স্বপ্ন দেখে আপনাকে বিফল করতে চায়, তখনই ব্ৰহ্ম সকলের চেয়ে সুদূর, এমন-কি, সকলের চেয়ে বিরুদ্ধ হয়ে প্ৰতিভাত হন । এ দিকে য়ুরোপে মানবশক্তি তখন প্রবলভাবে জাগ্রত হয়ে বৃহৎভাবে আপনাকে প্ৰকাশ করছে । কিন্তু, সে তখন আপনাকেই প্ৰকাশ করতে চাচ্ছে- আপনার চেয়ে বড়োকে নয়, সকলের চেয়ে শ্রেয়কে নয় । তার জ্ঞানের ক্ষেত্র বিশ্বব্যাপী, তার কর্মের ক্ষেত্র পৃথিবী-জোড়া, এবং সেই উপলক্ষে মানুষের সঙ্গে তার সম্বন্ধ সুদূরবিস্তৃত । কিন্তু, তার ধ্বজপতাকায় লেখা ছিল “আমি । তার মন্ত্র ছিল “জোর যার মুলুক তার’ । সে যে অস্ত্ৰপাণি রক্তবসনা শক্তিদেবতাকে জগতে প্রচার করতে চলেছিল তার বাহন ছিল পণ্যসম্ভার, অন্তহীন উপকরণ রাশি । কিন্তু, এই বৃহৎ ব্যাপারকে কিসে ঐক্যদান করতে পারে । এই বিরাট যজ্ঞের যজ্ঞপতি কে । কেউ বা বলে স্বােজাত্য, কেউ বা বলে রাষ্ট্রব্যবস্থা, কেউ বা বলে অধিকাংশের সুখসাধন, কেউ বা বলে মানবদেবতা । কিন্তু, কিছুতেই বিরোধ মেটে না, কিছুতেই ঐক্যদান করতে পারে না। প্রতিকূলতা পরস্পরের প্রতি ভুকুটি করে পরম্পরকে শান্ত রাখতে চেষ্টা করে এবং যাকে গ্ৰহণ করতে দলবদ্ধ স্বার্থের কোনোখানে বাধে তাকে একেবারে ধবংস করবার জন্যে সে উদ্যত হয়ে ওঠে । কেবল বিপ্লবের পর বিপ্লব আসছে, কেবল পরীক্ষার পর পরীক্ষা চলছে। কিন্তু, এ কথা একদিন জানতেই হবে, বাহিরে যেখানে বৃহৎ অনুষ্ঠান অস্তরে সেখানে ব্ৰহ্মকে উপলব্ধি না করলে কিছুতেই কিছুর সমন্বয় হতে পারবে না। প্রয়োজনবোধকে যত বড়ো নাম দেও, স্বাৰ্থসিদ্ধিকে যত বড়ো সিংহাসনে বসাও, নিয়মকে যত পাকা করে তোল এবং শক্তিকে যত প্ৰবল করে দাড় করাও, সত্যপ্রতিষ্ঠা কিছুতেই নেই- শেষ পর্যন্ত কিছুই টিকতে এবং টেকাতে পারবে না। যা প্ৰবল অথচ প্ৰশান্ত, ব্যাপক অথচ গভীর, আত্মসমাহিত অথচ বিশ্বানুপ্রবিষ্ট, সেই আধ্যাত্মিক জীবনসূত্রের দ্বারা না বেঁধে তুলতে পারলে অন্য কোনো কৃত্রিম জোড়াতাড়ার দ্বারা জ্ঞানের সঙ্গে জ্ঞান, কর্মের সঙ্গে কর্ম, জাতির সঙ্গে জাতি যথার্থভাবে সম্মিলিত হতে পারবে না। সেই সম্মিলন যদি না ঘটে। তবে আয়োজন যতই বিপুল হবে তার সংঘাতবেদনা ততই দুঃসহ হয়ে উঠতে থাকবে । যে সাধনা সকলকে গ্ৰহণ করতে ও সকলকে মিলিয়ে তুলতে পারে, যার দ্বারা জীবন একটি সর্বগ্রাহী