পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৬৪২

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


\SO রবীন্দ্র-রচনাবলী স্মরণ করে আনন্দিত হও । মানুষের জয়লক্ষ্মী তোমারই জন্যে প্রতীক্ষা করে আছে। এই কথা জেনে নিরলস উৎসাহে দুঃখত্ৰতকে আজ বীরের মতো গ্রহণ করো। প্ৰভু, আজ তোমাকে কোনো জয় বার্তা জানাতে পারলুম না । কিন্তু, যুদ্ধ চলছে, এ যুদ্ধে ভঙ্গ দেব না । তুমি যখন সত্য, তোমার আদেশ যখন সত্য, তখন কোনো পরাভবকেই আমার চরম পরাভব বলে গণ্য করতে পারব না। আমি জয় করতেই এসেছি ; তা যদি না আসতুম তবে তোমার সিংহাসনের সম্মুখে এক মুহুর্ত আমি দাড়াতে পারতুম না। তোমার পৃথিবী আমাকে ধারণ করেছে, তোমার সূৰ্য আমাকে জ্যোতি দিয়েছে, তোমার সমীরণ আমার মধ্যে প্রাণের সংগীত বাজিয়ে তুলেছে, তোমার মহামনুষ্যলোকে আমি অক্ষয় সম্পদের অধিকার লাভ করে জন্মগ্রহণ করেছি ; তোমার এত দানকে এত আয়োজনকে আমার জীবনের ব্যর্থতার দ্বারা কখনোই উপহাসিত করব না । আজ প্ৰভাতে আমি তোমার কাছে আরাম চাইতে, শান্তি চাইতে দাড়াই নি । আজ আমি আমার গৌরব বিস্মৃত হব না । মানুষের যজ্ঞ-আয়োজনকে ফেলে রেখে দিয়ে প্রকৃতির স্নিগ্ধ বিশ্রামের মধ্যে লুকোবার চেষ্টা করব না ! যতবার আমরা সেই চেষ্টা করি ততবার তুমি ফিরে ফিরে পাঠিয়ে দাও, আমাদের কাজ কেবল বাড়িয়েই দাও, তোমার আদেশ আরো তীব্র আরো কঠোর হয়ে ওঠে । কেননা, মানুষ আপনার মনুষ্যত্বের ক্ষেত্র থেকে পালিয়ে থাকবে তার এ লজ্জা তুমি স্বীকার করতে পার না । দুঃখ দিয়ে ফেরাও- পাঠাও তোমার মৃত্যুদূতকে, ক্ষতিদূতকে । জীবনটাকে নিয়ে যতই এলোমেলো করে ব্যবহার করেছি ততই তাতে সহস্ৰ দুঃসাধ্য গ্ৰন্থি পড়ে গেছে- সে তো সহজে মোচন করা যাবে না, তাকে ছিন্ন করতে হবে। সেই বেদনা থেকে আলস্যে বা ভয়ে আমাকে লেশমাত্র নিরস্ত হতে দিয়ে না । কতবার নববর্ষ এসেছে, কত নববর্ষের দিনে তোমার কাছে মঙ্গল প্রার্থনা করেছি । কিন্তু, কত মিথ্যা আর বলব । বারে বারে কত মিথ্যা সংকল্প আর উচ্চারণ করব । বাক্যের ব্যর্থ অলংকরকে আর কত রাশীকৃত করে জমিয়ে তুলব। জীবন যদি সত্য হয়ে না থাকে। তবে ব্যর্থ জীবনের বেদনা সত্য হয়ে উঠুকসেই বেদনার বহ্নিশিখায় তুমি আমাকে পবিত্র করো। হে রুদ্র, বৈশাখের প্রথম দিনে আজ আমি তোমাকেই প্ৰণাম কবি- তোমার প্রলয়লীলা আমার জীবনবীণার সমস্ত আলস্যসুপ্ত তারগুলোকে কঠিনবলে আঘাত করুক, তা হলেই আমার মধ্যে তোমার সৃষ্টিলীলার নব আনন্দসংগীত বিশুদ্ধ হয়ে বেজে উঠবে। তা হলেই তোমার প্রসন্নতাকে অবারিত দেখতে পাব, তা হলেই আমি রক্ষা পাব । রুদ্র, যত্তে দক্ষিণং মুখং তেন মাং পাহি নিত্যম। ১ বৈশাখ ১৩১৮ "טב סכ שהG) কর্ম করতে করতে কর্মসূত্রে এক-এক জায়গায় গ্রন্থি পড়ে ; তখন তাই নিয়ে কাজ অনেক বেড়ে যায় । সেইটে ছিড়তে, খুলতে, সেরে নিতে, চার দিকে কত রকমের টানাটানি করতে হয়- তাতে মন উত্ত্যক্ত হয়ে v35 এখানকার কাজে ইতিমধ্যে সেইরকমের একটা গ্ৰন্থি পড়েছিল ; তাই নিয়ে নানা দিকে একটা নড়াচাড়া টানাৰ্ছেড়া উপস্থিত হয়েছিল। তাই ভেবেছিলুম আজ মন্দিরে বসেও সেই জোড়াতাড়ার কাজ কতকটা বুঝি করতে হবে ; এ সম্বন্ধে কিছু বলতে হবে, কিছু উপদেশ দিতে হবে । মনের মধ্যে এই নিয়ে কিছু চিন্তা কিছু চেষ্টার আঘাত ছিল। কী করলে জট ছাড়ানো হবে, জঞ্জাল দূর হবে, হিতবাক্য তোমরা অবহিতভাবে শুনতে পারবে, সেই কথা আমার মনকে ভিতরে ভিতরে তাড়না দিচ্ছিল । এমন সময় দেখতে দেখতে উত্তর-পশ্চিমে ঘনঘোর মেঘ করে এসে সূর্যাস্তের রক্ত আভাকে বিলুপ্ত করে দিলে। মাঠের পরপারে দেখা গেল যুদ্ধক্ষেত্রের অশ্বারোহী দূতের মতো ধুলার ধ্বজা উড়িয়ে বাতাস উন্মত্তভাবে ছুটে আসছে ।