পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৬৪৫

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


শান্তিনিকেতন bNV) তা হােক, তবু সমুদ্রের মধ্যে বুদবুদেরও স্থান আছে। সমুদ্রের সমগ্ৰ সত্যটির সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে ঐ বুদবুদেরও যেটুকু সত্য সেটুকুকে একেবারে অস্বীকার করবার দরকারই হয় না। কিন্তু, আমরা যখন এই বুদবুদের মধ্যে বেষ্টিত হয়ে সমুদ্রের দিকে আমাদের দৃষ্টি একেবারে হারাই তখনই আমাদের বিপদ ঘটে । আমরা বড়োর মধ্যে আছি। এই কথাটি যখন আমাদের মনের মধ্যে স্পষ্ট থাকে তখন ছোটোকে স্বীকার করে নিলে আমাদের কোনো ক্ষতি হয় না । বড়ো জগতে আমাদের বাস, বড়ো সত্যে আমাদের চির আশ্ৰয়, এই কথাটি যাতে ভুলিয়ে দেয়। তাতেই আমাদের সর্বনাশ করে। বাইরে থেকে দেখতে গেলে বড়োতে আমাদের প্রয়োজন অতি অল্প । ছোটোখাটোর মধ্যে সহজেই আমাদের চলে যায়। কিন্তু যাতে তার কেবলমাত্র চলে যায় মানুষকে তার মধ্যে তো মানুষ থাকতে দেয় নি। মানুষকে সকল দিকেই মানুষ তার থেকে বাইরে টেনে আনছে। এই-যে তোমরা মানবশিশু, পৃথিবীতে তোমরা সকলের চেয়ে ছোটাে, আজ তোমাদের আমরা এই মন্দিরে এনেছি, জগতে সকলের চেয়ে যিনি বড়ো তাকে প্ৰণাম করতে । বাহির থেকে দেখলে কারও হাসি পেতে পারে, মনে হতে পারে। এর কী দরকার । ы কিন্তু, মনকে একবার জিজ্ঞাসা কোরো, এতবড়ো আকাশে, এতবড়ো বিশ্বব্ৰহ্মাণ্ডের মধ্যেই বা আমাদের জন্মাবার কী দরকার ছিল । আমাদের চার দিকে যথোপযুক্ত স্থানটুকু রেখে তার চার দিকে বেড়া তুলে দিলে কোনো অসুবিধা হত না ; বরঞ্চ অনেক বিষয়ে হয়তো সুবিধা হত, অনেক কাজ হয়তো সহজ হতে পারত। কিন্তু, ছোটোর পক্ষেও বড়োর একটি গভীরতম অন্তরতম দরকার আছে । সে এক দিকে অত্যন্ত ছোটো হয়েও আর-এক দিকে অত্যন্ত বড়োকে এক মুহুর্তের জন্যেও হারায় নি এই সত্যের মধ্যেই সে বেঁচে আছে। তার চার দিকে সমস্তই তাকে কেবল বড়োর কথাই বলছে । আকাশ কেবলই বলছে বড়ো, আলোক কেবলই বলছে বড়ো, বাতাস কেবলই বলছে বড়ো”। দিবসের পৃথিবী তাকে বলছে বড়ো, রাত্রের নক্ষত্রমণ্ডলী তাকে বলছে বড়ো”। গ্রহনক্ষত্র থেকে আরম্ভ করে নদী সমুদ্র প্রান্তর সকলেই তার কানের কাছে অহােরাত্র এই এক মন্ত্রই জপ করছে- “বড়ো” । ছোটাে মানুষটি বড়োর মধ্যেই দৃষ্টি মেলেছে, সে বড়োর মধ্যেই নিশ্বাস নিচ্ছে, সে বড়োর মধ্যেই সঞ্চারণ করছে। এইজন্যে মানুষ ছোটাে হয়েও কিছুতেই ছোটোতে সন্তুষ্ট হতে পারছে না । এমনকি, ছোটোর মধ্যে যে সুখ আছে তাকে ফেলে দিয়ে বড়োর মধ্যে যে দুঃখ আছে তাকেও মানুষ ইচ্ছাপূর্বক প্রার্থনা করে। মানুষের জ্ঞান সূর্য চন্দ্র তারার মধ্যেও তত্ত্ব সন্ধান করে বেড়ায় ; তার শক্তি কেবলমাত্র ঘরের মধ্যে আপনাকে আরামে আটকে রাখতে পারে না । এই বড়োর দিকেই মানুষের পথ, সেই দিকেই তার গতি, সেই দিকেই তার শক্তি, সেই দিকেই তার সত্য- এই সহজ কথাটি কখন সে ভুলতে থাকে ? যখন সে আপন হাতের-গড়া বেড়া দিয়ে আপনার চার দিক ঘিরে তুলতে থাকে । তখন এই জগৎ থেকে যে বড়োর মন্ত্রটি দিনরাত্রি উঠছে সেটি তার মনের মধ্যে প্রবেশ করবার পথ খুঁজে পায় না । আমরা ছোটাে হয়েও বড়ো এই মস্ত কথাটি তখন দিনে দিনে ভুলে যেতে থাকি । এবং আমাদের সেই এক বড়ো দেবতার আসনটি ছোটাে ছোটাে শতসহস্ৰ অপদেবতা এসে অধিকার করে বসে। বড়োর মধ্যেই আমাদের বাস এই সত্যটি স্মরণ করবার জন্যেই আমাদের ধ্যানের মন্ত্রে আছে ; ওঁ ভুর্ভুবঃ স্বঃ । এই কথাটা একেবারে ভুলে গিয়ে যখন আমরা নিশ্চয় করে মনে করে বসি ঘরের মধ্যেই আমাদের বাস, ধনের মধ্যেই আমাদের বাস, তখনই হৃদয়ের মধ্যে যত রাজ্যের উৎপাত জেগে ওঠে- যত কাম ক্ৰোধ লোভ মোহ। বন্ধ জলে বন্ধ বাতাসে যেমন কেবলই বিষ জমে, তেমনি যখনই মনে করি আমাদের সংসারক্ষেত্র আমাদের কর্মক্ষেত্রই আমাদের সত্য আশ্রয় তখনই বিরোধ বিদ্বেষ সংশয় অবিশ্বাস পদে পদে জেগে উঠতে থাকে ; তখনই আপনাকে ভুলতে পারি। নে এবং অন্যকে কেবলই আঘাত করি । যেমন আপনার সংসারের মধ্যেই সমস্ত জগৎকে না দেখে জগতের মধ্যেই আপনার সংসারকে দেখলে তবে সত্য দেখা হয়, সেই সত্যকে আশ্রয় করে থাকলে নিজের প্রবৃত্তির বিকৃতি সহজে ঘটতে পারে না, তেমনি প্রত্যেক মানুষকেও, আমাদের সত্য করে দেখা চাই। আমরা মানুষকে সত্য করে কখন দেখি নে ? কখন তাকে ছোটাে করে দেখি ? যখন আমার দিক থেকে ክተዛ8o