পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৬৫২

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


\NO রবীন্দ্র-রচনাবলী আমাদের ক্লাসে অল্প সময়েরই জন্য তাকে দেখতুম। ইংরাজি উচ্চারণ তার পক্ষে কষ্টসাধ্য ছিল, সেজন্যে ক্লাসের ছেলেরা তার পড়ানোতে শ্ৰদ্ধাপূর্বক মন দিত না ; বোধ করি সে তিনি বুঝতে পারতেন, কিন্তু তবু সেই পরম পণ্ডিত অবজ্ঞাপরায়ণ ছাত্রদের নিয়ে অবিচলিত শক্তির সঙ্গে প্রতিদিন তার কর্তব্য সম্পন্ন করে যেতেন । কিন্তু, নিশ্চয়ই তার সেই শান্তি কর্তব্যপরায়ণতার কঠোর শান্তি নয়। তার সেই শান্ত মুখশ্ৰীর মধ্যে আমি গভীর একটি মাধুর্য দেখতে পেতুম । যদিীচ আমি তখন নিতান্তই বালক ছিলুম, এবং এই অধ্যাপকের সঙ্গে নিকট-পরিচয়ের কোনো সুযোগই আমার ছিল না, তবু এই সীেম্যমূর্তি মৃদুভাষী তাপসের প্রতি আমার ভক্তি অত্যন্ত প্ৰগাঢ় ছিল । আমাদের এই অধ্যাপকটি সুশ্ৰী পুরুষ ছিলেন না, কিন্তু তাকে দেখলে বা তাকে স্মরণ করলে আমার মন আকৃষ্ট হত। আমি তার মধ্যে কী দেখতে পেতুম সেই কথাটি আজ আমি আলোচনা করে দেখছিলুম। র্তার যে সৌন্দৰ্য সে একটি নম্রতা এবং শুচিতার সৌন্দৰ্য । আমি যেন তার মুখের মধ্যে, তার ধীর গতির মধ্যে, তার শুচিশুত্ৰ চিত্তকে দেখতে পেতুম | এ দেশে আমরা শুচিতার একটি মূর্তি প্রায়ই দেখতে পাই, সে অত্যন্ত সংকীর্ণ। সে যেন নিজের চতুর্দিককে কেবলই নিজের সংস্রব থেকে ধুলোর মতো ঝেড়ে ফেলতে থাকে । তার শুচিতা কৃপণের ধানের মতো কঠিন সতর্কতার সঙ্গে অন্যকে পরিহার করে নিজেকে বঁচিয়ে রাখতে চায়। এইরকম কঠোর আত্মপরায়ণ শুচিতা বিশ্বকে কাছে টানে না, তাকে দূরে ঠেকিয়ে রাখে। কিন্তু, যথার্থ শুচিতার ছবি আমি আমার সেই অধ্যাপকের মধ্যে দেখেছিলুম। সেই শুচিতার প্রকৃতি কী, তার আশ্রয় কী ? আমরা শুচিতার বাহ্য লক্ষণ এই একটি দেখেছি- আহারে বিহারে পরিমিত ভাব রক্ষা করা । ভোগের প্রাচুর্য শুচিতার আদর্শকে যেন আঘাত করে। কেন করে। যা আমার ভালো লাগে তাকে প্রচুর পরিমাণে সঞ্চয় করা এবং ভোগ করার মধ্যে অপবিত্ৰতা কেন থাকবে। বিলাসের মধ্যে স্বভাবত দূষণীয় কী আছে। যে-সকল জিনিস আমাদের দৃষ্টি-ক্রতি-স্পৰ্শবোধকে পরিতৃপ্ত করে তারা তো সুন্দর, তাদের তো নিন্দা করবার কিছু নেই। তবে নিন্দটা কোনখানে ? বস্তুত নিন্দটা আমারই মধ্যে। যখন আমি সর্বপ্রযত্নে আমাকেই ভরণ করতে থাকি তখনই সেটা অশুচিকর হয়ে ওঠে । এই আমার দিকটার মধ্যে একটা অসত্য আছে যেজন্য এই দিকটা অপবিত্র । অন্নকে যদি গায়ে মাখি। তবে সেটা অপবিত্ৰ- কিন্তু, যদি খাই তাতে অশুচিতা নেই- কারণ, গায়ে মাখােটা অন্নের माउण दJदशद्र नग्न ! আমার দিকটা যখন একান্ত হয় তখন সে অসত্য হয়। এইজন্যেই সে অপবিত্র হয়ে ওঠে, কেননা কেবলমাত্র আমার মধ্যে আমি সত্য নাই । সেইজন্য যখন কেবল আমার দিকেই আমি সমস্ত মনটাকে দিই তখন আত্মা অসতী হয়ে ওঠে, সে আপনার শুচিতা হারায় । আত্মা পতিব্ৰতা স্ত্রীর মতো ; তার সমস্ত দেহ মন প্ৰাণ আপনার স্বামীকে নিয়েই সত্য হয় । তার স্বামীই তার প্রিয় আত্মা, তার সত্য আত্মা, তার পরম আত্মা । তার সেই স্বামীসম্বন্ধেই উপনিষদ বলেছেন : এষাস্য পরম গতিঃ, এষাস্য পরমা সম্পৎ, এষোহস্য পরমো লোকঃ, এযোহস্য পরম আনন্দঃ । ইনিই তার পরম গতি, ইনিই তার পরম সম্পদ, ইনিই তার পরম আশ্রয়, ইনিই তার পরম আনন্দ । কিন্তু যখন আমি সমস্ত ভোগকে আমার দিকেই টানতে থাকি, যখন অহোরাত্রি সমন্ত জীবন আমি এমন করে চলতে থাকি যেন আমার স্বামী নেই, আমার স্বামীর সংসারকে কেবলই বঞ্চনা করে নিজের অংশকেই অসতী । তখন আমি সত্যের ধন হরণ করে অসত্যের পূরণ করবার চেষ্টা করি। সে চেষ্টা চিরকালের মতো সফল হতেই পারে না ; যা-কিছু কেবল আমার দিকেই টানব তা নষ্ট হবেই, তার বৃহৎ সফলতা স্থায়ী সফলতা হতেই পারে না, তার জন্যে ভয় ভাবনা এবং শোকের অন্ত নেই। অসত্যের দ্বারা সত্যকে আঁকড়ে রাখা কোনোমতেই চলে না। ভোগের ফুলের মাঝখানে একটি কীট আছে, সেই কীট। আমি, এই অসত্য