পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৬৬৩

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


শান্তিনিকেতন V8S না ; তিনি চান যে তার বিশ্বের মধ্যে কেবল মানুষই আপনাকে গড়ে তুলবে, আপনার ভিতরকার মনুষ্যত্বটিকে অবাধে প্ৰকাশ করবে। সেইজন্যে তিনি মানুষের শিশুকে সকলের চেয়ে অসহায় করে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন, তাকে উলঙ্গ করে দুর্বল করে পাঠিয়েছেন। আর-সকলেরই জীবনরক্ষার জন্যে যে-সকল উপকরণের দরকার তা তিনি দিয়েছেন ; বাঘকে তীক্ষ নখদন্ত দিয়ে সাজিয়ে পাঠিয়েছেন । কিন্তু, এ কী তার আশ্চর্য লীলা যে, মানুষের শিশুকে তিনি সকলের চেয়ে দুর্বল অক্ষম ও অসহায় করে দিয়েছেন । কারণ, এরই ভিতর থেকে তিনি তার পরমা শক্তিকে দেখাবেন । যেখানে তার শক্তি সকলের চেয়ে বেশি। থেকেও সকলের চেয়ে প্রচ্ছন্ন হয়ে রয়েছে সেইখানেই তো তার আনন্দের লীলা। এই দুর্বল মনুষ্যশরীরের ভিতর দিয়ে-যে একটি পরমা শক্তি প্ৰকাশিত হবে এই তার আহবান । বিশ্বব্ৰহ্মাণ্ডে আর-সব তৈরি, চন্দ্ৰসূৰ্য তরুলতা সমস্তই তৈরি ; কেবল মানুষকেই তিনি অসম্পূর্ণ করে পাঠিয়েছেন । সকলের চেয়ে অসহায় করে মায়ের কোলে যাকে পাঠালেন। সেই-যে সকলের চেয়ে শক্তিশালী ও সম্পূর্ণ হবার অধিকারী, এই লীলাই তো তিনি দেখবেন । কিন্তু, আমরা কি তার এই ইচ্ছাকে ব্যৰ্থ করব। তিনি বাইরে আমাদের যে দুর্বলতার বেশ পরিয়ে পাঠিয়েছেন তারই মধ্যে আমরা আবৃত থাকিব, এ হলে আর কী হল। এ পৃথিবীতে তো কোথাও দুর্বলতা নেই। এই পৃথিবীর ভূমি কী নিশ্চল অটল, সূৰ্যর্চন্দ্ৰ গ্ৰহনক্ষত্ৰ আপন আপন কক্ষপথে কী স্থিরভাবে প্রতিষ্ঠিত ! এখানে একটি অণুপরমাণুরও নড়াচড় হবার জো নেই ; সমস্তই তার অটল শাসনে তার স্থির নিয়মে বিধৃত হয়ে নিজ নিজ কাজ করে যাচ্ছে। কেবল মানুষকেই তিনি অসম্পূর্ণ করে রেখেছেন। তিনি ময়ূরকে নানা বিচিত্র রঙে রঙিয়ে দিয়েছেন ; মানুষকে দেন নি, তার ভিতরে রঙের একটি বাটি দিয়ে বলেছেন, “তোমাকে তোমার নিজের রঙে সাজতে হবে ।’ তিনি বলেছেন, “তোমার মধ্যে সবই দিলুম, কিন্তু তোমাকে সেই সব উপকরণ দিয়ে নিজেকে কঠিন করে সুন্দর করে আশ্চর্য করে তৈরি করে তুলতে হবে, আমি তোমাকে তৈরি করে দেব না।” আমরা তা না করে যদি যেমন জন্মাই তেমনিই মরি, তবে তার এই লীলা কি ব্যর্থ হবে না। কী নিয়ে আমাদের দিনের পর দিন যাচ্ছে। প্রতিদিনের আবর্তনে কী জন্যে যে ঘুরে মরছি তার কোনো ঠিকানাই নেই। আজ যা হচ্ছে কালও তাই হচ্ছে, এক দিনের পর কেবল আর-এক দিনের পুনরাবৃত্তি চলছে : ঘানিতে জোতা হয়ে আছি, ঘুরে বেড়াচ্ছি একই জায়গায়। এর মধ্যে এমন কোনো নতুন আঘাত পাচ্ছি না যাতে মনে পড়ে আমি মানুষ । এই সাংসারিক জীবনযাত্রার প্রাত্যহিক অভ্যন্ত কর্মে আমরা কী পাচ্ছি। আমরা কী জড়ো করছি। এই সব জীৰ্ণ বোঝার মধ্যে একদিন কি এমনি ভাবেই জীবন পরিসমাপ্ত হবে । অভ্যাস, অভ্যাস- তারই জড় ভূপের নীচে তলিয়ে যাচ্ছি ; তারই উপরে যে আমাদের একদিন ঠেলে উঠতে হবে সেই কথাটিই ভুলে যাচ্ছি। মলিনতার উপর কেবলই মলিনতা জমা হচ্ছে ; অভ্যাসকে কেবলই বেড়ে যেতে দেওয়া হচ্ছে, এমনি করে নিজের কৃত্রিমতার বেড়ার মধ্যে সংকীর্ণ জায়গায় আমরা আবদ্ধ হয়ে রয়েছি, বিশ্বভুবনের আশ্চৰ্যলীলাকে দেখতে পাচ্ছি না। দেখবার বেলা দেখি উপকরণ, আসবাব, বাধা নিয়মে জীবনযন্ত্রের চাকা চালানো । তার আলো আর ভিতরে আসতে পথ পায় না ; ঐ-সব জিনিসগুলো আড়াল হয়ে দাঁড়ায় । তিনি আমাদের কাছে আসবেন বলে বলে দিয়েছেন, “তুমি তোমার আসনখানি তৈরি করে দাও, আমি সেই আসনে বসব, তোমার ঘরে গিয়ে বসব।” অথচ আমরা যা-কিছু আয়োজন করছি সে-সব নিজের জন্যে, তাকে বাদ দিয়ে বসেছি। জগৎ জুড়ে শ্যামল পৃথিবীর সকল সৌন্দর্যের মধ্যে তিনি আপনাকে বিকীর্ণ করে রয়েছেন, কেবল একটুখানি কালো জায়গা, আমাদের হৃদয়ের সেই কালে-কলঙ্কে-মলিন ধূলিতে-আচ্ছন্ন সেই একটুমাত্র কালো জায়গাতে তার স্থান হয় নি, সেইখানে তাকে আসতে নিষেধ করে দিয়েছি। সেই জায়গািটুকু আমার, সেখানে আমার টাকা রাখব, আসবাব জমাব, ছেলের জন্য বাড়ির ভিত কাটিব। সেখানে তাকে বলি, “তোমাকে ওখানে যেতে দিতে পারব না, তোমাকে ওখান থেকে নির্বাসিত করে দিলুম।” তাই এই এক আশ্চৰ্য ব্যাপার দেখছি যে, যে মানুষ সকলের চেয়ে বড়ো, যার মধ্যে ভূমির প্রকাশ, সেই মানুষেরই কি সকলের চেয়ে অকৃতাৰ্থ হবার শক্তি হল। আমাদের যে সেই শক্তি তিনিই দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “আর-সব জায়গায় আমি রয়েছি, কিন্তু তোমার ঘরে নিমন্ত্ৰণ না করলে আমি যাব না।” তিনি বলেছেন, “তোমরা কি আমাকে ডাকবে না । তোমরা যা ভোগ করছি আমাকে