পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৬৬৫

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


শান্তিনিকেতন Ve8\) ফুটেছিল। জগৎসংসারকে কি একেবারেই বঞ্চিত করে গেলেম, অভাবকে তো কিছু পূরণ করেছি, কিছু অজ্ঞান দূর করেছি। এই কথাটি তো বলে যেতে হবে। এ দিন যাবে। এই আলো চোখের উপর মিলিয়ে যাবে । সংসার তার দরজা বন্ধ করে দেবে, তার বাইরে পড়ে থাকব । তার আগে কি বলে যেতে পারব না। “কিছু দিতে পেরেছি । আমাদের সৃষ্টি করবার ভার যে স্বয়ং তিনি দিয়েছেন। তিনি যে নিজে সুন্দর হয়ে জগৎকে সুন্দর করে সাজিয়েছেন, এ নিয়ে তো মানুষ খুশি হয়ে চুপ করে থাকতে পারল না। সে বললে, “আমি ঐ সৃষ্টিতে আরো কিছু সৃষ্টি করব ।’ শিল্পী কী করে। সে কেন শিল্প রচনা করে। বিধাতা বলেছেন, “আমি এই-যে উৎসবের লণ্ঠন সব আকাশে বুলিয়ে দিয়েছি, তুমি কি আলপনা আঁকবে না। আমার রোশনচোঁকি তো বাজছেই, তোমার তাম্বুরা, কি একতারাই নাহয়, তুমি বাজাবে না ? সে বললে, “হা, বাজীব বৈকি ?’ গায়কের গানে আর বিশ্বের প্রাণে যেমন মিলল অমনি ঠিক গানটি হল । আমি গান সৃষ্টি করব বলে সেই গান তিনি শোনবার জন্যে আপনি এসেছেন । তিনি খুশি হয়েছেন ; মানুষের মধ্যে তিনি যে আনন্দ দিয়েছেন, প্ৰেম দিয়েছেন, তা যে মিলল তার সব আনন্দের সঙ্গে- এই দেখে তিনি খুশি । শিল্পী আমাদের মানুষের সভায় কি তার শিল্প দেখাতে এসেছে। সে যে তারই সভায় তার শিল্প দেখাচ্ছে, তার গান শোনাচ্ছে । তিনি বললেন, “বাঃ, এ যে দেখছি আমার সুর শিখেছে, তাতে আবার আধো আধো বাণী জুড়ে দিয়েছে- সেই বাণীর আধখানা ফোটে আধখানা ফোটে না ।” তার সুরে সেই আধফোটা সুর মিলিয়েছি শুনে তিনি বললেন, ‘খুশি হয়েছি।” এই-যে র্তার মুখের খুশি— না দেখতে পেলে সে শিল্পী নয়, সে কবি নয়, সে গায়ক নয়। যে মানুষের সভায় দাড়িয়ে মানুষ কবে জয়মাল্য দেবে এই অপেক্ষায় বসে আছে সে কিছুই নয়। কিন্তু, শিল্পী কেবলমাত্র রেখার সৌন্দৰ্য নিল, কবি সুর নিল, রস নিল। এরা কেউই সব নিতে পারল না। সব নিতে পারা যায় একমাত্র সমস্ত জীবন দিয়ে । তারই জিনিস তার সঙ্গে মিলে নিতে হবে । জীবনকে তার অমৃতরসে কানায় কানায় পূর্ণ করে যেদিন নিবেদন করতে পারব সেদিন জীবন ধন্য হবে। তার চেয়ে বড়ো নিবেদন আর কী আছে। আমরা তো তা পারি না। তার নৈবেদ্য থেকে সমস্ত চুরি করি ; কৃপণতা করে বলি, “নিজের জন্য সবই নেব। কিন্তু তাকে দেবার বেলা উদ্যবৃত্তমাত্র দিয়ে নিশ্চিন্ত হব।’ তাকে সমস্ত নিবেদন করে দিতে পারলে সব দরকার ভরে যায়, সব অভাব পূর্ণ হয়ে যায়। তাই বলছি আজ সেই জীবনের পরিপূর্ণ নিবেদনের দিন। আজ বলবার দিন—“তুমি আমাকে তোমার আসনের পাশে বসিয়েছিলে, কিন্তু আমি ভুলেছিলুম, আমি সব জুড়ে নিজেই বসেছিলুম- তোমার সঙ্গে বসব এ গীেরব ভুলে গেলুমতোমাতে আমাতে মিলে বসবার যে অপরূপ সার্থকতা এ জীবনে কি তা হবে না।’ আজ এই কথা বলব, “আমার আসন শূন্য রয়ে গেছে। তুমি এসো, তুমি এসো, তুমি এসে একে পূর্ণ করো। তুমি না এলে আমার এই গৌরবে কাজ কী, আমার ধুলোর মধ্যে ভিক্ষুকের মতো পড়ে থাকা যে ভালো।” হায় হায়, ধুলোবালি নিয়ে বাস্তবিকই এই-যে খেলা করছি এই কি আমার সৃষ্টি । এই সৃষ্টির কাজের জন্যেই কি আমার জীবনের এত আয়োজন হয়েছিল । মাঝে মাঝে কি পরম দুঃখে পরম আঘাতে এগুলো ভেঙে যায় নি । খেলাঘর একটু নাড়া দিলেই পড়ে যায়। কিন্তু, তোমাতে আমাতে মিলে যে সৃষ্টি তা কি একটু ফুয়ে এমনি করে পড়ে যেতে পারে । খেলাঘর কত যত্ন করেই গড়ে তুলি ; যেদিন আঘাত দিয়ে ভেঙে দেন সেদিন দেখিয়ে দেন যে তাকে বাদ দিয়ে একলা সৃষ্টি করবার কোনো সাধ্য আমাদের নেই। সেদিন কেঁদে উঠে আবার ভুলি, আবার ছিদ্র ঢাকবার চেষ্টা করি- এমনি করে সব ব্যর্থ হয়ে যায় । সব কৃত্রিমতা দূর করে দিয়ে আজ একদিনের জন্য দরজা খুলে ডাকি- হে আমার চিরদিনের অধীশ্বর, তোমাকে একদিনের জন্যেই ডাকলুম ! এই জীবনে শেষ নয়, এই পৃথিবীতেও শেষ নয়, আমি যে তোমার দর্শনার্থে তীর্থযাত্রায় বেরিয়েছি। ঘুরেই চলেছি, দেখা মেলেনি। আজ সব রুদ্ধতার মধ্যে একটু ফাক করে দিলেম, দেখা দিয়ে । অপরাধ তুমি যদি ক্ষমা না কর, পরমানন্দের কণা একটিও যদি না দাও, তবু এ কথা বলতে পারব না ‘ওগো আমি পারলুম না । আমি ক্লান্ত, অক্ষম, দুর্বল, আমি জবাব দিলুম, আমার সব পড়ে রইল- এ কথা বলব না । তোমার জন্য দুঃখ পেলেম এই কথা জানাবার সুখ যে তুমিই দেবে। দুঃখ আমার নিজের জন্য পেলে খেদের অবসান থাকে না । হে বন্ধু, তোমার জন্য বড়ো দুঃখ পেয়েছি। এ কথা