পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৬৬৯

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


শান্তিনিকেতন W8ʻq আমার সমস্ত প্ৰত্যক্ষ জানার কুল ছাপিয়ে কোথায় চলে গেছে। যে কাল গাত সে কালও তাকে ধরে রাখে নি, যে কাল সমাগত সে কালও তাকে ঠেকিয়ে রাখে নি, এমন-কি, মৃত্যুও তাকে আবদ্ধ করে নি। বরঞ্চ আমার বন্ধুকে ক্ষণে ক্ষণে ঘটনায় ঘটনায় যে ফাক ফাক করে দেখেছি সেই সীমাবচ্ছিন্ন দেখাগুলিকে সুনির্দিষ্টভাবে মনে আনতে চাইলে মন হার মানে- কিন্তু, সমস্ত খণ্ড জানার সীমাকে সকল দিকে পেরিয়ে গিয়ে আমার বন্ধুর যে-একটি পরম অনুভূতি অসীমের মধ্যে নিরন্তরভাবে উপলব্ধ হয়েছে। সেইটেই সহজ ; কেবল সহজ নয়, সেইটেই আনন্দময়। আমাদের প্রিয়জনের সমস্ত অনিত্যতার সীমা পূরণ করে তুলেছে এমন একটি চিরন্তনকে যেমন অনায়াসে যেমন আনন্দে আমরা দেখি তেমনি করেই র্যারা আপনার সহজ বিপুল বোধের দ্বারা সংসারের সমস্ত চলার ভিতরকার অসীম থাকাটিকে একান্ত অনুভব করেছেন তারাই বলেছেন : এষাস্য পরম গতিঃ, এবাস্য পরমা সম্পৎ, এষোহস্য পরমোলোকঃ, এষোহস্য পরমআনন্দঃ । এ তো জ্ঞানীর তত্ত্বকথা নয়, এ যে আনন্দের নিবিড় উপলব্ধি । এষঃ, এই-যে ইনি, এই-যে অত্যন্ত নিকটের ইনি, ইনিই জীবের পরম গতি, পরম ধন, পরম আশ্রয়, পরম আনন্দ । তিনি এক দিকে যেমন গতি আর-এক দিকে তেমনি আশ্রয়, এক দিকে যেমন সাধনার ধন আর-এক দিকে তেমনি সিদ্ধির আনন্দ । কিন্তু, আমাদের লৌকিক বন্ধুকে আমরা অসীমতার মধ্যে উপলব্ধি করছি বটে, তবু সীমার মধ্যেই তার প্ৰকাশ ; নইলে তার সঙ্গে আমার কোনো সম্বন্ধই থাকত না । অতএব, অসীম ব্ৰহ্মকে আমাদের নিজের উপকরণ দিয়ে নিজের কল্পনা দিয়ে আগে নিজের মতো গড়ে নিতে হবে, তার পরে তার সঙ্গে আমাদের ব্যবহার চলতে পারে- এমন কথা বলা হয়ে থাকে । কিন্তু, আমার বন্ধুকে যেমন আর নিজের হাতে গড়তে হয় নি এবং যদি গড়তে হত তা হলে কখনো তার সঙ্গে আমার সত্য বন্ধুত্ব হত না— বন্ধুর বাহিরের প্রকাশটি আমার চেষ্টা আমার কল্পনার নিরপেক্ষ— তেমনি অনন্তস্বরূপের প্রকাশও তো আমার সংগ্ৰহ-করা উপকরণের অপেক্ষা করে নি ; তিনি অনন্ত বলেই আপনার স্বাভাবিক শক্তিতেই আপনাকে প্রকাশ করছেন । যখনই তিনি আমাদের মানুষ করে সৃষ্টি করেছেন তখনই তিনি আপনাকে আমাদের অন্তরে বাহিরে মানুষের ধন করে ধরা দিয়েছেন, তাকে রচনা করবার বরাত তিনি আমাদের উপরে দেন নি। প্ৰভাতের অরুণ-আভা তো আমারই, বনের শ্যামল শোভা তো আমারই- ফুল যে ফুটেছে সে কার কাছে ফুটেছে। ধরণীর বীণাযন্ত্রে যে নানা সুরের সংগীত উঠেছে সে সংগীত কার জন্যে । আর, এই তো রয়েছে মায়ের কোলের শিশু, বন্ধুর-দক্ষিণ-হস্ত-ধরা বন্ধু, এই তো ঘরে বাহিরে যাদের ভালোবেসেছি। সেই আমার প্রিয়জন ; এদের মধ্যে যে অনির্বাচনীয় আনন্দ প্রসারিত হচ্ছে, এই আনন্দ যে আমার আনন্দময়ের নিজের হাতের পাতা আসন । এই আকাশের নীল চাঁদোয়ার নীচে, এই জননী পৃথিবীর বিচিত্র আলপনা-আঁকা বরণবেদিটির উপরে আমার সমস্ত আপন লোকের মাঝখানে সেই সত্যং জ্ঞানমনন্তং ব্ৰহ্ম আনন্দরূপে অমৃতরূপে বিরাজ করছেন । এই সমস্ত থেকে, এই তার আপনার আত্মদান থেকে, অবিচ্ছিন্ন করে নিয়ে কোন কল্পনা দিয়ে গড়ে কোন দেয়ালের মধ্যে র্তাকে স্বতন্ত্র করে ধরে রেখে দেব । সেই কি হবে। আমাদের কাছে সত্য, আর যিনি অন্তর বাহির ভরে দিয়ে নিত্য নবীন শোভায় চিরসুন্দর হয়ে বসে রয়েছেন তিনিই হবেন তত্ত্বকথা ? তারই এই আপন আনন্দনিকেতনের প্রাঙ্গণে আমরা তাকে ঘিরে বসে অহােরাত্র খেলা করলুম, তবু এইখানে এই সমস্তর মাঝখানে আমাদের হৃদয় যদি জাগল না, আমরা তাকে যদি ভালোবাসতে না পারলুম, তবে জগৎজোড়া এই আয়োজনের দরকার কী ছিল । তবে কেন এই আকাশের নীলিমা, আমারাত্রির অবগুণ্ঠনের উপরে কেন এই সমস্ত তারার চুমকি বসানো, তবে কেন বসন্তের উত্তরীয় উড়ে এসে ফুলের গন্ধে দক্ষিনে হাওয়াকে উতলা করে তোলে। তবে তো বলতে হয় সৃষ্টি বৃথা হয়েছে, অনন্ত যেখানে নিজে দেখা দিচ্ছেন সেখানে র্তার সঙ্গে মিলন হবার কোনো উপায় নেই । বলতে হয় যেখানে তার সদাব্রত সেখানে আমাদের উপবাস ঘোচে না ; মা যে অন্ন স্বহস্তে প্ৰস্তুত করে নিয়ে বসে আছেন সন্তানের তাতে তৃপ্তি নেই, আর ধুলোবালি নিয়ে খেলার অন্ন যা সে নিজে রচনা করেছে। তাইতে তার পেট ভরবে । না, এ কেবল সেই সকল দুর্বল উদাসীনদের কথা যারা পথে চলবে না এবং দূরে বসে বসে বলবে পথে চলাই যায় না। একটি ছেলে নিতান্ত একটি সহজ কবিতা আবৃত্তি করে পড়ছিল । আমি তাকে জিজ্ঞাসা