পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৬৭১

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


শান্তিনিকেতন ఆ8సి এমনি করে মানুষ যখন সহজ করবার জন্যে আপনার পূজাকে ছোটাে করতে গিয়ে পূজনীয়কে একপ্রকার বাদ দিয়ে বসে তখন পুনশ্চ সে এই দুৰ্গতি থেকে আপনাকে বাচাঁবার ব্যগ্রতায় অনেক সময় আর-এক বিপদে গিয়ে পড়ে- আপন পূজনীয়কে এতই দূরে নিয়ে গিয়ে বসিয়ে রাখে। সেখানে আমাদের পূজা পেঁৗছতে পারে না, অথবা পেঁৗছতে গিয়ে তার সমস্ত রস শুকিয়ে যায়। এ কথা তখন মানুষ ভুলে যায় যে, অসীমকে কেবলমাত্র ছোটো করলেও যেমন তাকে মিথ্যা করা হয় তেমনি তাকে কেবলমাত্র বড়ো করলেও তাকে মিথ্যা করা হয় ; তাকে শুধু ছোটাে করে আমাদের বিকৃতি, তাকে শুধু বড়ো করে আমাদের শুষ্কতা । অনন্ত ব্ৰহ্ম, অনন্ত বলেই ছোটো হয়েও বড়ো এবং বড়ো হয়েও ছোটো । তিনি অনন্ত বলেই সমস্তকে ছাড়িয়ে আছেন এবং অনন্ত বলেই সমস্তকে নিয়ে আছেন । এইজন্যে মানুষ যেখানে মানুষ, সেখানে তো তিনি মানুষকে ত্যাগ করে নেই। তিনি পিতামাতার হৃদয়ের পাত্র দিয়ে আপনিই আমাদের স্নেহ দিয়েছেন, তিনি মানুষের শ্ৰীতির আকর্ষণ দিয়ে আপনি আমাদের হৃদয়ের গ্রন্থি মোচন করেছেন ; এই পৃথিবীর আকাশেই তার যে বীণা বাজে তারই সঙ্গে আমাদের হৃদয়ের তার এক সুরে বাধা ; মানুষের মধ্য দিয়েই তিনি আমাদের সমস্ত সেবা গ্ৰহণ করছেন, আমাদের কথা শুনছেন এবং শোনাচ্ছেন ; এইখানেই সেই পুণ্যলোক, সেই স্বৰ্গলোক, যেখানে জ্ঞানে প্ৰেমে কমে সর্বতোভাবে তার সঙ্গে আমাদের মিলন ঘটতে পারে । অতএব মানুষ যদি অনন্তকে সমস্ত মানবসম্বন্ধ হতে বিচুত করে জানাই সত্য মনে করে তবে সে শূন্যতাকেই সত্য মনে করবে। আমরা মানুষ হয়ে জন্মেছি। যখনই এ কথা সত্য হয়েছে তখনই এ কথাও সত্য-অনন্তের সঙ্গে আমাদের সমস্ত ব্যবহার এই মানুষের ক্ষেত্রেই, মানুষের বুদ্ধি, মানুষের প্ৰেম, মানুষের শক্তি নিয়েই । এইজন্যে ভূমার আরাধনায় মানুষকে দুটি দিক বঁচিয়ে চলতে হয়। এক দিকে নিজের মধ্যেই সেই ভুমার আরাধনা হওয়া চাই, আর-এক দিকে অন্য আকারে সে যেন নিজেরই আরাধনা না হয় ; এক দিকে নিজের শক্তি নিজের হৃদয়বৃত্তিগুলি দিয়েই তার সেবা হবে, আর-এক দিকে নিজেরই রিপুগুলিকে ধর্মের রসে সিক্ত করে সেবা করবার উপায় করা যেন না হয় । অনন্তের মধ্যে দূরের দিক এবং নিকটের দিক দুইই আছে ; মানুষ সেই দূর ও নিকটের সামঞ্জস্যকে যে পরিমাণে নষ্ট করেছে। সেই পরিমাণে ধর্ম যে কেবল তার পক্ষে অসম্পূর্ণ হয়েছে তা নয়, তা অকল্যাণ হয়েছে। এইজন্যেই মানুষ ধর্মের দোহাই দিয়ে সংসারে যত দারুণ বিভীষিকার সৃষ্টি করেছে এমন সংসারবুদ্ধির দোহাই দিয়ে নয়। আজ পর্যন্ত ধর্মের নামে কত নরবলি হয়েছে এবং কত নরবলি হচ্ছে তার আর সীমাসংখ্যা নেই ; সে বলি কেবলমাত্র মানুষের প্রাণের বলি নয়- বুদ্ধির বলি, দয়ার বলি, প্রেমের বলি। আজ পর্যন্ত কত দেবমন্দিরে মানুষ আপনার সত্যকে ত্যাগ করেছে, আপনার মঙ্গলকে ত্যাগ করেছে। এবং কুৎসিতকে বরণ করেছে। মানুষ ধর্মের নাম করেই নিজেদের কৃত্রিম গণ্ডির বাইরের মানুষকে ঘূণা করবার নিত্য অধিকার দাবি করেছে। মানুষ যখন হিংসাকে, আপনার প্রকৃতির রক্তপায়ী কুকুরটাকে, একেবারে সম্পূর্ণ শিকল কেটে ছেড়ে দিয়েছে তখন নির্লজ্জভাবে ধর্মকে আপনি সহায় বলে আহবান করেছে। মানুষ যখন বড়ো বড়ো দস্যুবৃত্তি করে পৃথিবীকে সন্ত্রস্ত করেছে তখন আপনার দেবতাকে পূজার লোভ দেখিয়ে দলপতির পদে নিয়োগ করেছে বলে কল্পনা করেছে। কৃপণ যেমন করে আপনার টাকার থলি লুকিয়ে রাখে তেমনি করে আজও আমরা আমাদের ভগবানকে আপনার সম্প্রদায়ের লোহার সিন্ধুকে তালা বন্ধ করে রেখেছি বলে আরাম বোধ করি এবং মনে করি যারা আমাদের দলের নামটুকু ধারণ না করেছে। তারা ঈশ্বরের ত্যাজ্যপুত্ররূপে কল্যাণের অধিকার হতে বঞ্চিত । মানুষ ধর্মের দোহাই দিয়েই এই কথা বলেছে। এই সংসার বিধাতার প্রবঞ্চনা, মানব-জন্মটাই পাপ, আমরা ভারবাহী বলদের মতো হয় কোনো পূর্বপিতামহের নয় নিজের জন্মজন্মান্তরের পাপের বােঝা বহে নিয়ে অন্তহীন পথে চলেছি। ধর্মের নামেই অকারণ ভয়ে মানুষ পীড়িত হয়েছে এবং অদ্ভুত মুঢ়তায় আপনাকে ইচ্ছাপূর্বক অন্ধ করে রেখেছে। কিন্তু, তবু এই সমস্ত বিকৃতি ও ব্যর্থতার ভিতর দিয়েও ধর্মের সত্যরূপ নিত্যরূপ ব্যক্ত হয়ে উঠছে। বিদ্রোহী মানুষ সমূলে তাকে ছেদন করবার চেষ্টা করে কেবল তার বাধাগুলিকেই ছেদন করছে। অবশেষে এই কথা মানুষের উপলব্ধি করবার সময় এসেছে যে, অসীমের আরাধনা মনুষ্যত্বের কোনো অঙ্গের উচ্ছেদ-সাধন নয়, মনুষ্যত্বের পরিপূর্ণ পরিণতি । অনন্তকে একই কালে এক দিকে আনন্দের দ্বারা, অন্য দিকে