পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৬৭৬

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


VeG8 রবীন্দ্ৰ-রচনাবলী অথচ এই জরার হাত থেকে মানুষকে তো রক্ষা পেতে হবে । কেমন করে পাবে, কোথায় পাবে । যেখানে চিরপ্রাণ সেইখানে পাবে। সে প্রাণের লীলার ধারা তো একসূত্রের ধারা নয় । দেখো-না কেন, রাত্রির পরে দিন নতুন নতুন পুষ্পে পুষ্পিত হয়ে প্রকাশ পাচ্ছে। দিনান্তে নিশীথের তারা নতুন করেই আপনার দীপ জ্বালাচ্ছে। মৃত্যুর সূত্রে প্রাণের মালাকর অমনি করে জীবনের ফুলকে নবীন করে গেঁথে তুলছেন । কিন্তু, সংসার একটানা মৃত্যুকে ধরে রেখেছে, সে সব জিনিসকে কেবলই ক্ষয় করতে করতে সেই অতল গহবরে নিয়ে গিয়ে ফেলে। কিন্তু, এই একটানা মৃত্যুর ধারা যদি চরম সত্য হত। তবে তো কিছুই নতুন হয়ে উঠত না, তবে তো এত দিনে পৃথিবী পাচে উঠত, তবে জরার মূর্তিই সব জায়গায় প্রকাশ পেত। সেইজন্য মানুষ উৎসবের দিনে বলে ; আমি এই মৃত্যুর ধারাকে মানব না, আমি অমৃতকে চাই। এ কথাও মানুষ বলেছে : অমৃতকে আমি দেখেছি, আমি পেয়েছি, সমস্তই বেঁচে আছে অমৃতে । মৃত্যুর সাক্ষ্য চারিদিকে, অথচ মানুষ বলে উঠেছে ; ওগো শোনো, তোমরা অমৃতের পুত্ৰ, তোমরা মৃত্যুর পুত্ৰ নাও - শৃশ্বস্তু বিশ্বে অমৃতস্য পুত্ৰাঃ আ যে ধামানি দিব্যানি তস্থঃ বেদাহমেতং পুরুষং মহান্তং । আমি তাকে জেনেছি। এই বার্তা র্যারা বলেছেন তারা সে কথা বলবার আরম্ভে সম্বোধনেই আমাদের কী আশ্বাস দিয়ে বলেছেন “তোমরা দিব্যধামবাসী অমৃতের পুত্ৰ— তোমরা সংসারবাসী মৃত্যুর পুত্র নও’ ! জগতের মৃত্যুর বঁাশির ভিতর দিয়ে এই অমৃতের সংগীত যে প্রচারিত হচ্ছে। এ সংগীত তো পশুরা শুনতে পায় না । তারা খেয়েদেয়ে ধুলোয় কাদায় লুটিয়ে দিন কাটিয়ে দিচ্ছে। অমৃতের সংগীত যে তোমরাই শোনবার অধিকারী । কেন । তোমরা যে মৃত্যুর অধীন নও, তোমরা মৃত্যুর একটানা পথেই চলছ না শৃশ্বস্তু বিশ্বে অমৃতস্য পুত্ৰাঃ আ যে ধামানি দিব্যানি তস্থঃ । তোমরা যে ধামে রয়েছ, যে লোকে বাস করছ, সে কোন লোক । তোমরা কি এই পৃথিবীর ধুলোমাটিতেই রয়েছ যেখানে সমস্ত জীর্ণ হয়ে ঝরে ঝরে পড়ছে। না, তোমরা দিব্যলোকে বাস করছ, অমৃতলোকে বাস করছি। এই কথা মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে মানুষ বলছে, সমস্ত সাক্ষ্যকে অস্বীকার করে মানুষ বলছে। এ কথা সে মরতে মরতে বলছে । এই মাটির উপর মাটির জীবের সঙ্গে বাস করে বলছে : তোমরা এই মাটিতে বাস করছ না, তোমরা দিব্যধামে বাস করছি । সেই দিব্যধামের আলো কোথা থেকে আসে ৷ তমসঃ পরস্তাৎ । তমসার পরপর থেকে আসে । এই মৃত্যুর অন্ধকার সত্য নয়, সত্য সেই জ্যোতি যা যুগে যুগে মোহের অন্ধকারকে বিদীর্ণ করে আসছে। যুগে যুগে মানুষ অজ্ঞানের ভিতর থেকে জ্ঞানকে পাচ্ছে, যুগে যুগে মানুষ পাপকে মলিনতাকে বিদীর্ণ করে পুণ্যকে আহরণ করছে। বিরোধের ভিতর দিয়ে সত্যকে পাচ্ছে, এ ছাড়া সত্যকে পাবার আর-কোনো উপায় মানুষের নেই । যারা মনে করছে এই জ্যোতিই অসত্য, এই দিব্যধামের কথা কল্পনা মাত্র, তাদের কথা যদি সত্য হত তবে মাটিতে মানুষ একদিন যেমন জন্মেছিল ঠিক তেমনিই থাকত, তার আর কোনো বিকাশ হত না । মানুষের মধ্যে অমৃত রয়েছে বলেই না মৃত্যুকে ভেদ করে সেই অমৃতের প্রকাশ হচ্ছে। ফোয়ারা যেমন, তার ছোটাে একটুখানি ছিদ্ৰকে ভেদ করে উর্ধের্ব আপনার ধারাকে উৎক্ষিপ্ত করে, তেমনি এই মৃত্যুর সংকীর্ণ ছিদ্রের ভিতর দিয়ে অমৃতের উৎস উঠছে। যারা এটা দেখতে পেয়েছেন তারা ডাক দিয়ে বলেছেন : ভয় কোরো না, অন্ধকার সত্য নয়, মৃত্যু সত্য নয়, তোমাদের অমৃতের অধিকার । মৃত্যুর কাছে দাসখত লিখে দিয়ে না ; যদি প্রবৃত্তির হাতে আত্মসমর্পণ কর তবে এই অমৃতত্বের অধিকারকে যে অপমানিত করবে। কীট যেমন করে ফুলকে খায় তেমনি করে প্রবৃত্তি যে একে খেতে থাকবে । তিনি নিজে বলেছেন ; তোরা অমৃতের পুত্র, আমার মতন তােরা। আর আমরা সে কথা প্রতিদিন মিথ্যা করব ?