পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৬৮৩

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


শান্তিনিকেতন 29ܠ পৃথিবীতে জন্মাইনি, সৌন্দর্যের সুধারসে পেয়ালা ভরে তাকে নিঃশেষে পান করে মৃত্যুকে উপেক্ষা করে চলে যাব।” মাধুর্যের প্রকাশ কেবল ললিতকলায় নয়। এই সৌন্দৰ্যসুধার মধ্যে বীর্যের আগুন রয়েছে ; মানুষ যেদিন এই সৌন্দৰ্যসুধা পান করবে। সেদিন দুঃখের মাথার উপরে সে দাড়াবে, আগুনে ঝাপ দিয়ে পড়বে। মানুষ বিষয়বিষ্যরসের মত্ততায় বিহবল হয়ে সেই আনন্দরসকে পান করল না। সেই আনন্দের মধ্যে বীর্ষের অগ্নি রয়েছে, সেই অগ্নিতেই সমস্ত গ্ৰহচন্দ্ৰলোক দীপ্যমান হয়ে উঠেছে- সেই বীর্যের অগ্নি মানুষের মনুষ্যত্বকে জাগিয়ে তুলল না। অথচ মানুষের অন্তরাত্মা জানে যে জগতের সুধাপাত্র পরিপূর্ণ আছে বলেই মৃত্যু এখানে কেবলই মরছে এবং জীবনের ধারাকে প্রবাহিত করছে- প্ৰাণের কোথাও বিরাম নেই। অন্তরাত্মা জানে যে, সেই সুধার ধারা জীবন থেকে জীবনান্তরে, লোক থেকে লোকান্তরে বয়েই চলেছে। কত যোগী, কত প্ৰেমী, কত মহাপুরুষ সেই সুধার ধারায় সমস্ত জীবনকে ডুবিয়ে অমৃতত্বের সাক্ষ্য দিয়েছেন । তারা মানুষকে ডাক দিয়ে বলেছেন, “তোমরা অমৃতের পুত্র, মৃত্যুর পুত্র নও।” কিন্তু, সে কথায় মানুষের বিশ্বাস হয় না । সে যে বিষয়ের দাসত্ব করছে সেইটেই তার কাছে বাস্তব, আর এ-সব কথা তার কাছে শূন্য ভাবুকতামাত্র। সে তাই এসব কথাকে বিদ্রুপ করে, আঘাত করে, অবিশ্বাস করে। র্যারা অমৃতের বাণী এনেছেন মানুষ তাই তাদের মেরেছে। তারা যেমন মানুষের হাতে মার খেয়েছেন এমন আর কেউ নয়, অথচ তারা তো মলেন না । তাদের প্রাণই। শত সহস্ৰ বৎসর ধরে সজীব হয়ে রইল । কারণ, তারাই যে মার খেতে পারেন ; তারা যে অমৃতের সন্ধান পেয়েছেন। মৃত্যুর দ্বারা তারা অমৃতের প্রমাণ করেন। মানুষের দরজায় এসে দাড়ালে মানুষ তাদের আতিথ্য দেয় নি, আতিথ্য দেবে না ; মানুষ তাদের শত্রু বলে জেনেছে । কারণ, আমরা আমাদের যতী-কিছু মত বিশ্বাস সমস্ত পাথরে বঁধিয়ে রেখে দিয়েছি, ঐ-সব পাগলকে ঘরে ঢোকালে সে-সমস্ত যে বিপর্যন্ত হয়ে যাবে এই মানুষের মস্ত ভয় । মৃত্যুকে কোটার মধ্যে পুরে লোহার সিন্দুকে লুকিয়ে রেখে দিয়েছি, ওরা ঘরে এলে কি আর রক্ষা আছে। লোহার সিন্দুক ভেঙে যে মৃত্যুকে এরা বার করবে। সেই মৃত্যুকেই তারা মারতে আসেন। তারা মরে প্রমাণ করেন আছে সুধা সমস্ত বিশ্বকে পূর্ণ করে। নিঃশেষে পরম আনন্দে সেই সুধার পাত্র থেকে তারা পান করেন । তারা প্ৰিয়তমকে জেনেছেন, প্ৰিয়তম তাদের জীবনে জেগেছেন । আমাদের গানে তাই আমরা ডাকাছি ; প্রিয়তম হে, জাগো, জাগো, জাগো। কেন না, প্রিয়তম হে, তুমি জাগ নি বলেই মনুষ্যত্ববিকাশ হল না, পৌরুষ পরাহত হয়ে রইল। তোমার কণ্ঠের বিজয়মাল্য দাও পরিয়ে তুমি আমাদের কষ্ঠে, জয়ী করো সংগ্রামে। সংসারের যুদ্ধে পরাভূত হতে দিয়ে না। বাচাও, তোমার অমৃতপাত্র আমার মুখে এনে দাও । অপমানের মধ্যে পরাভবের মধ্যে তোমাকে ডাকাছি ; জাগো, জাগো, জাগো । জাগরণের আলোকে সমস্ত দেশ উজ্জ্বল হয়ে উঠুক। ১১ মাঘ ১৩২১, সন্ধ্যার উপদেশ । यद्दून »७२» একটি মন্ত্র সাধারণ ব্ৰাহ্মসমাজ-গৃহে পঠিত মানুষের পক্ষে সব চেয়ে ভয়ংকর হচ্ছে অসংখ্য । এই অসংখ্যের সঙ্গে একলা মানুষ পেরে উঠবে কেন । সে কত জায়গায় হাতজোড় করে দাড়াবে । সে কত পূজার অর্ঘ্য কত বলির পশু সংগ্রহ করে মরবে। তাই মানুষ অসংখ্যের ভয়ে ব্যাকুল হয়ে কত ওঝা ডেকেছে কত জাদুমন্ত্র পড়েছে তার ঠিক নেই। একদিন সাধক দেখতে পেলেন, যা-কিছু টুকরো টুকরো হয়ে দেখা দিচ্ছে তাদের সমস্তকে অধিকার করে এবং সমস্তকে পেরিয়ে আছে সত্যং । অর্থাৎ, যা-কিছু দেখছি তাকে সম্ভব করে আছে একটি না-দেখা পদাৰ্থ ।