পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৬৮৬

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


\სტ\98 রবীন্দ্র-রচনাবলী আচল নয়, যেখানে তার নব নব উদযোগ, যেখানে সামনের দিকে মানুষের গতি, যেখানে অতীতের খোটায় সে আপনাকে আপাদমস্তক বেঁধেছেদে স্থির হয়ে বসে নেই, যেখানে আপনার এগোবার পথকে সকল দিকে মুক্ত রাখবার জন্যে মানুষ সর্বদাই সচেতন। জ্বালানি কাঠ যখন পূর্ণতেজে জ্বলে না। তখন সে ধোয়ায় কিংবা ছাইয়ে ঢাকা পড়ে । তেমনি দেখা গেছে, যে জাতি আপনার প্রাণকে চলতে না দিয়ে কেবলই বাধতে চেয়েছে তার সত্য সকল দিক থেকেই স্নান হয়ে এসে তাকে নিজীব করে ; কেননা সত্যের ধর্ম জড়ধর্ম নয়, প্ৰাণধৰ্ম- চলার দ্বারাই তার প্রকাশ । নিজের ভিতরকার বেগবান প্ৰাণের আনন্দে মানুষ যখন অক্লান্ত সন্ধানের পথে সত্যের পূজা বহন করে তখনই বিশ্বসৃষ্টির সঙ্গে তারও সৃষ্টি চারি দিকে বিচিত্র হয়ে ওঠে ; তখন তার রথ পর্বত লঙ্ঘন করে, তার তরণী সমুদ্র পার হয়ে যায়, তখন কোথাও তার আর নিষেধ থাকে না। তখন সে নূতন নূতন সংকটের মধ্যে ঘা পেতে থাকে বটে, কিন্তু নুড়ির ঘা খেয়ে ঝর্নার কলাগান যেমন আরো জেগে ওঠে তেমনি ব্যাঘাতের দ্বারাই বেগবান প্ৰাণের মুখে নুতন নূতন ভাষার সৃষ্টি হয়। আর, যারা মনে করে স্থির হয়ে থাকাই সত্যের সেবা, চলাই সনাতন সত্যের বিরুদ্ধে অপরাধ, তাদের অচলতার তলায় ব্যাধি দারিদ্র্য অপমান অব্যবস্থা কেবলই জমে ওঠে, নিজের সমাজ তাদের কাছে নিষেধের কাটাখেত, দূরের লোকালয় তাদের কাছে দুৰ্গম । নিজের দুৰ্গতির জন্যে তারা পরকে অপরাধী করতে চায়, এ কথা ভুলে যায় যে যে-সব দড়িদড়া দিয়ে তারা সত্যকে বন্দী করতে চেয়েছিল সেইগুলো দিয়ে তারা আপনাকে বেঁধে আড়ষ্ট হয়ে পড়ে আছে । যদি জানতে চাই মানুষের বুদ্ধিশক্তিটা কী, তবে কোনখানে তার সন্ধান করব । যেখানে মানুষের গণনাশক্তি চিরদিন ধরে পাচের বেশি আর এগোতে পারলে না সেইখানে ? যদি জানতে চাই মানুষের ধর্ম কী, তবে কোথায় যাব । যেখানে সে ভূতপ্রেতের পূজা করে, কাষ্ঠলোষ্ট্রের কাছে নরবলি দেয় সেইখানে ? না, সেখানে নয়। কেননা, সেখানে মানুষ বাধা পড়ে আছে। সেখানে তার বিশ্বাসে তার আচরণে সম্মুখীন গতি নেই। চলার দ্বারাই মানুষ আপনাকে জানতে থাকে, কেননা চলাই সত্যের ধর্ম। যেখানে মানুষ চলার মুখে, সেইখানেই আমরা মানুষকে স্পষ্ট করে দেখতে পাই- কেননা মানুষ সেখানে আপনাকে বড়ো করে দেখায়- যেখানে আজো সে পীেছোয় নি। সেখানটিকেও সে আপনার গতিবেগের দ্বারা নির্দেশ করে দেয় । তার ভিতরকার সত্য তাকে চলার দ্বারাই জানাচ্ছে যে, সে যা তার চেয়ে সে অনেক বেশি । তবেই দেখতে পাচ্ছি। সত্যের সঙ্গে সঙ্গে একটি জানা লেগে আছে । আমাদের যে বিকাশ সে কেবল হওয়ার বিকাশ নয়, সে জানার বিকাশ । হতে থাকার দ্বারা চলতে থাকার দ্বারাই আপনাকে আমরা জানতে থাকি । সত্যের সঙ্গে সঙ্গেই এই জ্ঞান লেগে রয়েছে, সেইজন্যেই মন্ত্রে আছে : সত্যং জ্ঞানং । অর্থাৎ, সত্য যার বাহিরের বিকাশ জ্ঞান তার অন্তরের প্রকাশ । যে সত্য কেবলই হয়ে উঠেছে মাত্র অথচ সেই হয়ে ওঠা আপনাকেও জানছে না, কাউকে কিছু জানাচ্ছেও না, তাকে আছে বলাই যায় না। আমার মধ্যে জ্ঞানের আলোটি যেমনি জ্বলে অমনি যা-কিছু আছে সমস্ত আমার মধ্যে সার্থক হয়। এই সার্থকতাটি বৃহৎভাবে বিশ্বের মধ্যে নেই, অথচ খণ্ডভাবে আমার মধ্যে আছে, এমন কথা মনে করতে পারে নি বলেই মানুষ বলেছে : সত্যং জ্ঞানং । সত্য সর্বত্র, জ্ঞানও সর্বত্র । সত্য কেবলই জ্ঞানকে ফল দান করছে, জ্ঞান কেবলই সত্যকে সার্থক করছে- এর আর অবধি নেই। এ যদি নাহয় তবে অন্ধ সৃষ্টির কোনো অর্থই নেই। উপনিষদে ব্ৰহ্ম সম্বন্ধে বলেছে তার ‘স্বাভাবিকী জ্ঞানবিলক্রিয়া চ” । অর্থাৎ, তার জ্ঞান বল ও ক্রিয়া স্বাভাবিক। তার বল আর ক্রিয়া এই তো হল। যা-কিছু ; এই তো হল জগৎ । চার দিকে আমরা দেখতে পাচ্ছি বল কাজ করছে ; স্বাভাবিক এই কাজ । অর্থাৎ, আপনার জোরেই আপনার এই কাজ চলছে ; এই স্বাভাবিক বল ও ক্রিয়া যে কী জিনিস তা আমরা আমাদের প্রাণের মধ্যে স্পষ্ট করে বুঝতে পারি। এই বল ও ক্রিয়া হল বাহিরের সত্য। তারই সঙ্গে সঙ্গে একটি অন্তরের প্রকাশ আছে, সেইটি হল জ্ঞান। আমরা বুদ্ধিতে বোঝবার চেষ্টায় দুটিকে স্বতন্ত্র করে দেখছি, কিন্তু বিরাটের মধ্যে এ একেবারে এক হয়ে আছে। সর্বত্র জ্ঞানের চালনাতেই বল ও ক্রিয়া চলছে এবং বল ও ক্রিয়ার প্রকাশেই জ্ঞান আপনাকে উপলব্ধি করছে । “স্বাভাবিকী জ্ঞানবিলক্রিয়া চ' মানুষ এমন কথা বলতেই পারত না, যদি সে নিজের মধ্যে স্বাভাবিক জ্ঞান ও প্ৰাণ এবং