পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৬৮৭

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


শান্তিনিকেতন VeVe? উভয়ের যোগ একান্ত অনুভব না করত । এইজন্যই গায়ত্রীমন্ত্রে এক দিকে বাহিরের ভূর্তৃবঃ স্বঃ এবং অন্য দিকে অন্তরের ধী উভয়কেই একই পরমশক্তির প্রকাশরাপে ধ্যান করবার উপদেশ আছে। যেমন প্ৰদীপের মুখের ছোটাে শিখাটি বিশ্বব্যাপী উত্তাপেরই অঙ্গ তেমনি আমার প্রাণ বিশ্বের প্রাণের অঙ্গ, তেমনি আমার জানাও বিচ্ছিন্ন ব্যাপার নয় । মানুষ পৃথিবীর এক কোণে বসে যুক্তির দাড়িপাল্লায় সূর্যকে ওজন করছে এবং বলছে, “আমার জ্ঞানের জোরেই বিশ্বের রহস্য প্ৰকাশ হচ্ছে।” কিন্তু, এ জ্ঞান যদি তারই জ্ঞান হত। তবে এটা জ্ঞানই হত না ; বিরাট জ্ঞানের যোগেই সে যা-কিছু জানতে পারছে। মানুষ অহংকার করে বলে আমার শক্তিতেই আমি কলের গাড়ি চালিয়ে দূরত্বের বাধা কাঁটাচ্ছি ; কিন্তু তার এই শক্তি যদি বিশ্বশক্তির সঙ্গে না মিলত তা হলে সে এক ●N3 bढ्ठ °द्मऊ न् | সেইজন্যে যেদিন মানুষ বললে সত্যং সেইদিনই একই প্ৰাণময় শক্তিকে আপনার মধ্যে এবং আপনার বাহিরে সর্বত্র দেখতে পেলে । যেদিন বললে জ্ঞানং সেইদিন সে বুঝলে যে, সে যা-কিছু জানছে এবং যা-কিছু ক্ৰমে জানবে সমস্তই একটি বৃহৎ জানার মধ্যে জাগ্রত রয়েছে। এইজন্যই আজ তার এই বিপুল ভরসা। জন্মেছে যে, তার শক্তির এবং জ্ঞানের ক্ষেত্র কেবলই বেড়ে চলবে, কোথাও সে থেমে যাবে না । এখন সে আপনারই মধ্যে অসীমের পথ পেয়েছে, এখন তাকে আর যাগযজ্ঞ যাদুমন্ত্র পৌরোহিত্যের শরণ নিতে হবে না । এখন তার প্রার্থনা এই-- অসতো মা সদগময় তমসো মা জ্যোতিগময় । অসত্যের জড়তা থেকে চিরবিকাশমান সত্যের মধ্যে আমাকে নিয়ত চালনা করো, অন্ধকার হতে আমার জ্ঞানের আলোক উমীলিত হতে থাক । আমাদের মন্ত্রের শেষ বাক্যটি হচ্ছে : অনন্তং ব্ৰহ্ম । মানুষ আপনার সত্যের অনুভবে সত্যকে সর্বত্র দেখছে, আপনার জ্ঞানের আলোকে জ্ঞানকে সর্বত্র জানছে, তেমনি আপনার আনন্দের মধ্যে মানুষ অনন্তের যে পরিচয় পেয়েছে তারই থেকে বলছে ‘অনন্তং ব্ৰহ্ম । কোথায় সেই পরিচয় । আমাদের মধ্যে অনন্ত সেখানেই, যেখানে আমরা আপনাকে দান করে আনন্দ পাই । দানের দ্বারা যেখানে আমাদের কেবলমাত্র ক্ষতি সেইখানেই আমাদের দারিদ্র্য, আমাদের সীমা, সেখানে আমরা কৃপণ। কিন্তু, দানই যেখানে আমাদের লাভ, ত্যাগই যেখানে আমাদের পুরস্কার, সেখানেই আমরা আমাদের ঐশ্বৰ্যকে জানি, আমাদের অনন্তকে পাই । যখন আমাদের সীমােরাপী, অহংকেই আমরা চরম বলে জানি তখন কিছুই আমরা ছাড়তে চাই নে, সমস্ত উপকরণকে তখন দু হাতে আঁকড়ে ধরি- মনে করি বস্তুপুঞ্জের যোগেই আমরা সত্য হব, বড়ো হব । আর, যখনই কোনো বৃহৎ প্রেম বৃহৎ ভাবের আনন্দ আমাদের মধ্যে জেগে ওঠে তখনই আমাদের কৃপণতা কোথায় চলে যায় ! তখন আমরা রিক্ত হয়ে পূর্ণ হয়ে উঠি, মৃত্যুর দ্বারা অমৃতের আস্বাদ পাই । এইজন্য মানুষের প্রধান ঐশ্বর্যের পরিচয় বৈরাগ্যে, আসক্তিতে নয়, আমাদের সমস্ত নিত্যকীর্তি বৈরাগ্যের ভিত্তিতে স্থাপিত । তাই মানুষ বলেছে ; ভূমৈব সুখং, ভূমাই আমার সুখ ; ভূমীত্বেব বিজিজ্ঞাসিতব্যঃ, ভূমাকেই আমার জানতে হবে ; নাল্পে সুখমস্তি, অল্পে আমার সুখ নেই। এই ভূমাকে মা যখন সন্তানের মধ্যে দেখে তখন তার আর আত্মসুখের লালসা থাকে না । এই ভূমাকে মানুষ যখন স্বদেশের মধ্যে দেখে তখন তার আর আত্মপ্রাণের মমতা থাকে না। যে সমাজনীতিতে মানুষকে অবজ্ঞা করা ধর্ম বলে শেখায় সে সমাজের ভিতর থেকে মানুষ আপনার অনন্তকে পায় না ; এইজন্যই সে সমাজে কেবল শাসনের পীড়া আছে, কিন্তু ত্যাগের আনন্দ নেই। মানুষকে আমরা মানুষ বলেই জানি নে যখন তাকে আমরা ছােটাে করে জানি। মানুষ সম্বন্ধে যেখানে আমাদের জ্ঞান কৃত্রিম সংস্কারের ধূলিজালে আবৃত সেইখানেই মানুষের মধ্যে ভূমা আমাদের কাছে আচ্ছন্ন। সেখানে কৃপণ মানুষ আপনাকে ক্ষুদ্র বলতে, অক্ষম বলতে, লজা বোধ করে না । সত্যকে মতে মানি, কাজে করতে পারি নে” এ কথা স্বীকার করতে সেখানে সংকোচ ঘটে না । সেখানে মঙ্গল-অনুষ্ঠানও বাহ্য-আচার-গত হয়ে ওঠে। কিন্তু, মানুষের মধ্যে ভুমা যে আছে, এইজন্যই ভূমিত্ত্বেব বিজিজ্ঞাসিতব্যঃ, ভূমাকে না জানলে সত্য জানা হয় না । সমাজের মধ্যে যখন