পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৬৮৮

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


VeqVe ब्रोझ-ब्रष्नांदळेी সেই জানা সকল দিকে জেগে উঠবে তখন মানুষ ‘আনন্দরূপমমৃতং আপনার আনন্দরূপকে অমৃতরূপকে সর্বত্র সৃষ্টি করতে থাকবে। প্রদীপের শিখার মতো আত্মদানেই মানুষের আত্ম-উপলব্ধি। এই কথাটি আপনার মধ্যে নানা আকারে প্রত্যক্ষ করে মানুষ অনন্তস্বরাপকে বলেছে ‘আত্মদা, তিনি আপনাকে দান করছেন, সেই দানেই তার পরিচয় । এইবার আমাদের সমস্ত মন্ত্রটি একবার দেখে নিই। : সত্যং জ্ঞানমনন্তং ব্ৰহ্ম । অনন্ত ব্ৰহ্মের সীমারীপটি হচ্ছে সত্য । বিশ্বব্ৰহ্মাণ্ডে সত্যনিয়মের সীমার মধ্য দিয়েই অনন্ত আপনাকে উৎসগ করছেন । প্রশ্ন এই যে, সত্য যখন সীমায় বদ্ধ তখন অসীমকে প্ৰকাশ করে কেমন করে । তার উত্তর এই যে, সত্যের সীমা আছে, কিন্তু সত্য সীমার দ্বারা বদ্ধ নয়। এইজন্যই সত্য গতিমান। সত্য আপনার গতির দ্বারা কেবলই আপনার সীমাকে পেরিয়ে পেরিয়ে চলতে থাকে, কোনো সীমায় এসে একেবারে ঠেকে যায় না । সত্যের এই নিরন্তর প্রকাশের মধ্যে আত্মদান করে অনন্ত আপনাকেই জানছেন, এইজনাই মন্ত্রের একপ্ৰান্তে সত্যং আর-এক প্ৰান্তে অনন্তং ব্ৰহ্মা- তারই মাঝখানে জ্ঞানং । এই কথাটিকে বাক্যে বলতে গেলেই স্বতোবিরোধ এসে পড়ে । কিন্তু, সে বিরোধ কেবল বাক্যেরই । আমরা যাকে ভাষায় বলি সীমা সেই সীমা ঐকান্তিকরূপে কোথাও নেই, তাই সীমা কেবলই অসীমে মিলিয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে। আমরা যাকে ভাষায় বলি অসীম সেই অসীমও ঐকান্তিক ভাবে কোথাও নেই, তাই অসীম কেবলই সীমায় রূপগ্রহণ করে প্রকাশিত হচ্ছেন । সত্যও অসীমকে বর্জন করে সীমায় নিশ্চল হয়ে নেই, অসীমও সত্যকে বর্জন করে শূন্য হয়ে বিরাজ করছেন না। এইজন্য ব্ৰহ্ম সীমা এবং সীমাহীনতা দুইয়েরই অতীত, তার মধ্যে রূপ এবং অপরূপ দুইই সংগত হয়েছে। তাকে বলা হয়েছে “বিলদা, তার বল তার শক্তি বিশ্বসত্যরূপে প্ৰকাশিত হচ্ছে ; আবার আত্মদা, সেই সত্যের সঙ্গে সেই শক্তির সঙ্গে তার আপনার বিচ্ছেদ ঘটে নি- সেই শক্তির যোগেই তিনি আপনাকে দিচ্ছেন । এমনি করেই সসীম অসীমের, অরূপ স্বরূপের, অপরূপ মিলন ঘটে গেছে । সত্যং এবং অনন্তং অনির্বাচনীয়রূপে পরস্পরের যোগে একই কালে প্রকাশমান হচ্ছে। তাই অসীমের আনন্দ সসীমের অভিমুখে, সসীমের আনন্দ অসীমের অভিমুখে । তাই ভক্ত ও ভগবানের আনন্দমিলনের মধ্যে আমরা সসীম ও অসীমের এই বিশ্বব্যাপী প্রেমলীলার চির রহস্যটিকে ছোটোর মধ্যে দেখতে পাই । এই রহস্যটি রবিচন্দ্ৰতারার উঠেছে। সত্যের সঙ্গে অনন্তের এই নিত্যযোগ লোকস্থিতির শান্তিতে, সমাজস্থিতির মঙ্গলে ও জীবাত্মা-পরমাত্মার একাত্ম মিলনে শান্তং শিবমদ্বৈতম রূপে প্ৰকাশমান হয়ে উঠছে। এই শান্তি জড়িত্বের নিশ্চল শান্তি নয়, সমস্ত চাঞ্চল্যের মর্ম-নিহিত শান্তি ; এই মঙ্গল দ্বন্দ্ববিহীন নিজীব মঙ্গল নয়, সমস্ত দ্বন্দ্বমস্থনের আলোড়ন-জাত মঙ্গল : এই অদ্বৈত একাকারিত্বের অদ্বৈত নয়, সমস্ত বিরোধবিচ্ছেদের সমাধানকারী অদ্বৈত । কেননা, তিনি ‘বলদা আত্মদা ; সত্যের ক্ষেত্রে শক্তির মধ্য দিয়েই তিনি কেবলই আপনাকে দান করছেন । সত্যং জ্ঞানমনন্তং ব্ৰহ্মা- এই মন্ত্রটি তো কেবলমাত্র ধ্যানের বিষয় নয়, এটিকে প্ৰতিদিনের সাধনায় জীবনের মধ্যে গ্ৰহণ করতে হবে । সেই সাধনটি কী। আমাদের জীবনে সত্যের সঙ্গে অনন্তের যে বাধা ঘটিয়ে বসেছি, যে বাধা-বশত আমাদের জ্ঞানের বিকার ঘটছে, সেইটে দূর করে দিতে থাকা । এই বাধা ঘটিয়েছে আমাদের অহং । এই অহং আপনার রাগদ্বেষের লাগাম এবং চাবুক নিয়ে আমাদের জীবনটাকে নিজের সুখদুঃখের সংকীর্ণ পথেই চালাতে চায়। তখন আমাদের কর্মের মধ্যে শাস্তকে পাই নে, আমাদের সম্বন্ধের মধ্যে শিবের অভাব ঘটে এবং আত্মার মধ্যে অদ্বৈতের আনন্দ থাকে না । কেননা, সত্যং জ্ঞানমনন্তং ব্ৰহ্মা ; অনন্তের সঙ্গে যোগে তবেই সত্য জ্ঞানময় হয়ে ওঠে, তবেই আমাদের জ্ঞানবিলক্রিয়া স্বাভাবিক হয় । যাদের জীবন বেগে চলছে, অথচ কেবলমাত্র আপনাকেই কেন্দ্র করে প্রদক্ষিণ করছে, তাদের সেই চলা সেই বলক্রিয়া কলুর বলদের চলার মতো ; তা স্বাভাবিক নয়, তা জ্ঞানময় নয় । আবার, যারা জীবনের সত্যের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন করে অনন্তকে কর্মহীন সন্ন্যাসের মধ্যে উপলব্ধি করতে কিংবা