পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৭০২

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


Vgbro রবীন্দ্র-রচনাবলী পাচ্ছে। সেইজন্য সমস্ত অনুষ্ঠানের ভিতরকার আদর্শ হচ্ছে মানুষকে মুক্তি দেওয়া । মানুষ নিজেকে যে ছোটাে বলে জানছে মানুষের ধর্ম কর্ম তারই প্রতিবাদ করে তাকে বলছে : তুমি ছোটাে নাও ; তুমি আপনার মধ্যে আপনি বদ্ধ নাও ; তুমি সমস্ত জগতের ; তুমি বড়ো, বড়ো, বড়ো । কিন্তু, মানুষের এই বড়ো বড়ো অনুষ্ঠানের মধ্যে মানুষের ভিতরে যে শয়তান রয়েছে সে প্রবেশ করছে। মানুষের ধর্ম তাকে ভূমীর সঙ্গে বড়োর সঙ্গে যোগযুক্ত করবে, সকলকে এক করবে, এই তো তার উদ্দেশ্য। কিন্তু, সেই ধর্মের মধ্যে শয়তান প্রবেশ করে মানুষের ঐক্যকে খণ্ড খণ্ড করে দিচ্ছে ; কত অন্যায়, কত অসত্য, কত সংকীর্ণতা সৃষ্টি করছে। মানুষের জাতীয়তা, ইংরেজিতে যাকে nationality KG, TIPAP উদভিন্ন হয়ে উঠেছে। এইজন্য যে তার মধ্যে মানুষের সাধনা মিলিত হয়ে মানুষের এক বৃহৎ রূপকে ব্যক্তি করবে, ক্ষুদ্র স্বাৰ্থ থেকে প্রত্যেক মানুষকে মুক্ত করে বৃহৎমঙ্গলের মধ্যে সকলকে সম্মিলিত করবে। কিন্তু, সেই তপস্যা ভঙ্গ করবার জন্যে শয়তান সেই জাতীয়তাকেই অবলম্বন করে কত বিরোধ কত আঘাত কত ক্ষুদ্রতাকে দিন দিন তার মধ্যে জাগিয়ে তুলছে। মানুষের তপস্যা এক দিকে, অন্য দিকে তপস্যা ভঙ্গ করবার আয়োজন- এ দুইই পাশাপাশি রয়েছে। শান্তিনিকেতন-আশ্রমেও সেই তপস্যা রয়েছে ; ধর্ম যে কত বড়ো, বিশ্ব যে কত সত্য, মানুষ যে কত বড়ো, এই আশ্রম সে কথা নিয়তই স্মরণ করিয়ে দেবে। এইখানে আমরা মানুষের সমস্ত ভেদ জাতিভেদ ভুলব । আমাদের দেশে চারিদিকে ধর্মের নামে যে অধৰ্ম চলছে, মানুষকে কত ক্ষুদ্র করে সংকীর্ণ করে তার মানবধর্মকে নষ্ট করবার আয়োজন চলছে, আমরা এই আশ্রমেই সেই বন্ধন থেকে মুক্ত হব । এত বড়ো আমাদের কাজ । কিন্তু, আমরা একে কেউ বা স্কুলের মতো করে দেখছি। কেউ বা আপনার আপনার ছোটোখাটো চিন্তার মধ্যে বদ্ধ হয়ে রয়েছি । একে আমরা উপলব্ধি করছি নে বলে গোলমাল করতে করতে চলেছি। আপনার সত্য পরিচয় পাচ্ছি নে, এরও যথার্থ পরিচয় পাচ্ছি নে । এই আশ্রমের চারি দিকে যে একটি অনন্তত্ব রয়েছে তাকেই নষ্ট করছি। কেবলই আবর্জনা ফেলছি, আমাদের ছােটাে ছোটাে প্ৰকৃতির। দুর্বলতা কত আবর্জনাকে কেবলই বর্ষণ করছে। এমনি করে এখানকার স্থান সংকীর্ণ হয়ে উঠছে। প্রত্যেকের রাগদ্বেষ-মোহমলিনতার দ্বারা এখানকার বাতাস কলুষিত হচ্ছে, আকাশ অবরুদ্ধ হচ্ছে। আমি অধিক কথা বলতে চাই না । বাক্যের দ্বারা ক্ষণিক উত্তেজনা ও উৎসাহ সঞ্চার করার উপর আমার কোনো বিশ্বাস নেই। আমি জানি প্ৰত্যেকের জীবন নিজের ভিতর থেকে নিজের শক্তিকে উপলব্ধি করতে না পারলে বক্তৃতা বা উপদেশে কোনো ফললাভ হয় না। প্রতি দিনের সাধনায় শক্তিকে জাগ্ৰত করে তবে আমরা মুক্তি পাব । আমি বৃথা এ আক্ষেপও রাখতে চাই না যে, কিছু হচ্ছে না । শান্তভাবে গভীরভাবে স্তব্ধ হয়ে আমাদের আপনার ভিতরে দেখতে হবে যে, “শান্তিং শিবং অদ্বৈতং রয়েছেন ; তিনি সত্য, তিনি আমার ভিতরে সত্য, তিনি জগতে সত্য । দেখি কোনখানে বাধছে, কোনখানে জগতের মধ্যে যিনি “শাস্তং শিবং অদ্বৈতং তার শাস্তিতে আমি ব্যাঘাত করছি। এ প্রত্যেককে আলাদা করে নিজের ভিতরে দেখতে হবে । কারণ, প্রত্যেকের জীবনের সমস্যা স্বতন্ত্র । কার কোনখানে দীনতা ও কৃপণতা তা তো আমরা জানি না । এই মন্দিরে আমাদের যেমন সম্মিলিত উপাসনা হচ্ছে তেমনি আমাদের প্রত্যেকের স্বতন্ত্র সাধনা এইখানেই জেগে উঠুক। একবার আমাদের চিত্তকে চিন্তাকে গভীর করে অন্তরের মধ্যে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। আমরা একবার দেখবার চেষ্টা করি এই আশ্রমের মধ্যে যে সত্যসাধনা রয়েছে সেটি কী । আর-একবার মনকে দিয়ে বলিয়ে নিই ; পিতা নোহসি । পিতা নো বোধি। এ যে কত বড়ো বোধ । সেই বোধের দ্বারা আমাদের দৃষ্টির কলুষ, আমাদের বুদ্ধির জড়তা, আমাদের চৈতন্যের সংকীর্ণতা দূর হয়ে যাক। এ তো কোনো উপদেশের দ্বারা হবার জো নেই। যেমন করে ছোটাে অঙ্গার থেকে বৃহৎ অগ্নি জ্বলে উঠতে পারে তেমনি করে এই ছোটাে কথাটি থেকে বোধের অগ্নি জ্বলে উঠুক ; দগ্ধ হােক সকল মলিনতা ও সংকীর্ণতা । যদি সমস্ত ইচ্ছাকে জাগ্রত করে আমরা এই সত্যকে গ্ৰহণ করি তবেই এই বোধ উদবোধিত হবে, যদি না করি তবে হবে না । মিথ্যার মধ্যে জড়িয়ে আছি- যদি বলি তাই নিয়েই কাটবে, কাটাও, কেউ কোনো বাধা দেবে না । সংসারে কেউ তার থেকে উদ্ধার করতে পারবে না । কোনো উপদেশ কোনো উত্তেজনায় ফল হবে না । মানুষের কণ্ঠে নয়, এই স্তবমন্ত্রের বাণী বিশ্বের কণ্ঠে জেগে উঠুক। এই বাণী জগতে শক্তি প্রয়োগ করুক,