পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৭১৮

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


VəəVe রবীন্দ্ৰ-রচনাবলী করে। পূর্বকালের সঙ্গে কিছু মেলে না, এ হতেই পারে না, কিন্তু সে যেন শরতের সঙ্গে শীতের মিলনের মতো । মনের যে-ঋতুতে মহুয়া লেখা সে আকস্মিক ঋতুই, ফর্মাসের ধাক্কায় আকস্মিক নয়, স্বভাবতই আকস্মিক । এগুলি যখন লিখছিলুম অপূর্বকুমার প্রায় রোজ এসে শুনে যেত, সে যে-উত্তেজনা প্ৰকাশ করত সেটা অপূর্বতারই উত্তেজনা। রূপের দিকে বা ভাবের দিকে একটা-কিছু নতুন পাচ্ছে বলেই তার আগ্রহ— তখন সুধীন্দ্র দত্তও ছিল তার সঙ্গী। তার থেকে আমার বিশ্বাস আপনার এই সমর্থন পেত যে, মনের মধ্যে রচনার একটি বিশেষ ঋতুর সমাগম হয়েছে- তাকে পূরবীর ঋতু বা বলাকার ঋতু বললে চলবে না। পূরবী ও মহুয়ার মাঝখানে আর-একদল কবিতা আছে— সেগুলি অন্য জাতের । তাদের মধ্যে নটরাজ ও ঋতুরঙ্গই প্রধান । নৃত্যাভিনয়ের উপলক্ষ নিয়ে এগুলি রচিত হয়েছিল। কিন্তু এরাও স্বভাবতই উপলক্ষকে অতিক্রম করেছে। আর কোনোখানেই শান্তিনিকেতনের মতো ঋতুর লীলারঙ্গ দেখি নি- তারই সঙ্গে মানবভাষায় উত্তর প্রত্যুত্তর কিছুকাল থেকে আমার চলছে । তার রীতিমত শুরু হয়েছে শারদোৎসবে- তার পরে ঋতুগীতির প্রবাহ বেয়ে এসে পড়েছিল ঋতুরঙ্গে । বিষয় এক তবু প্ৰভেদ যথেষ্ট । সেই প্ৰভেদ যদি না থাকত তা হলে লেখবার উৎসােহই থাকত না । মহুয়ার কবিতা যখন পড়বে তখন আমার স্বভাবের এই কথাটা মনে রেখো । এই বইয়ের প্রথমে ও সব শেষে যে-গুটিকয়েক কবিতা আছে সেগুলি মহুয়া পর্যায়ের নয় । সেগুলি ঋতু-উৎসব পর্যায়ের । দোলপূর্ণিমায় আবৃত্তির জন্যেই এদের রচনা করা হয়েছিল । কিন্তু নববসন্তের আবির্ভাবই মহুয়া কবিতার উপযুক্ত ভূমিকা বলে নাকিবের কাজে ওদের এই গ্রন্থে আহবান করা হয়েছে। মহুয়া নামটা নিয়ে তোমার মনে একটা দ্বিধা হয়েছিল জানি । কাব্যের বা কাব্যসংকলন-গ্রন্থের নামটাকে ব্যাখ্যামূলক করতে আমার প্রবৃত্তি হয় না। নামের দ্বারা আগেভাগে কবিতার পরিচয়কে সম্পূর্ণ বেঁধে দেওয়াকে আমি অত্যাচার মনে করি। কবিতার অতিনির্দিষ্ট সংজ্ঞা প্রায়ই দেওয়া চলে না । আমি ইচ্ছা করেই মহুয়া নামটি দিয়েছি, নাম পাছে ভাষ্যরূপে কর্তৃত্ব করে এই ভয়ে । অথচ কবিতাগুলির সঙ্গে মহুয়া নামের একটুখানি সংগতি আছে— মহুয়া বসন্তেরই অনুচর, আর ওর রসের মধ্যে প্রচ্ছন্ন আছে উন্মাদনা । যাই হােক, অর্থের অত্যন্ত বেশি সুসংগতি নেই বলেই কাব্যগ্রন্থের পক্ষে এ নামটি উপযুক্ত বলে আমি বিশ্বাস করি । কবির স্বহস্তোঙ্কিত নামপত্র এবং উৎসগা কবিতাটি প্ৰচলিত সংস্করণের মতো রচনাবলী-সংস্করণ মহুয়াতেও মুদ্রিত হইয়াছে। মহুয়ার প্রথম সংস্করণে “সবলা’ কবিতাটির চতুর্থ ছত্র বাদ পড়িয়াছিল। পরবতী কালে স্মৃতি হইতে সংশোধন করিবার সময় রবীন্দ্ৰনাথ পুলিনবিহারী সেনকে ২৭ অক্টোবর ১৯৩৯ তারিখের একটি পত্রে সম্পূর্ণ এক নূতন পঙক্তি লিখিয়া পাঠান : মহুয়াতে “সবলা” বলে যে কবিতাটি আছে, তাতে একটা লাইন ছুটি হয়েছে নারীকে আপন ভাগ্য জয় করিবার কেন নাহি দিবে অধিকার হে বিধাতঃ, সংকোচের দৈন্যজাল কেন তুমি পাতো এই শেষের লাইনটা পড়ে গিয়েছে- এই লাইনটাকে উদ্ধার কোরো। পরের লাইনে আছে— পথপ্ৰান্তে কেন র’ব জাগি পথপ্ৰান্তে শব্দের পর সেমিকোলন দেওয়া চলে। কিনা ভেবে দেখে- তা হলে মনে হবে। সংকোচের জালটা পাতা হচ্ছে চলাবার পথে । ৭ অপূর্বকুমার চন্দ