পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৭২৫

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


গ্রন্থপরিচয় QOVO আরেক দিন যখন বছর দুয়েক হল দক্ষিণ আমেরিকায় যাত্রা করেছিলুম। তখন মনের মধ্যে কোনো ভার ছিল না । র্যারা আমাকে নিমন্ত্রণ করেছিলেন তারা আমাকে ভরসা দিয়েছিলেন যে, তারা আমার কাছ থেকে বক্তৃতা চান না, আমাকেই চান। দেশের দিক থেকেও কোনো অনুরোধ নিয়ে আসি নি, কেবল জাহাজোঁ ওঠবার আগে একটি বাঙালী মেয়ের চিঠি পেয়েছিলুম, সে ইচ্ছে জানিয়েছিল। আমি যেন ডায়ারি লিখি । তার পরে ভেসে পড়লুম সমুদ্রে । মন অনেকদিন এমন মুক্তি পায় নি । সামনে পিছনে কর্তব্যের তাগিদ নেই, আশেপাশেও তথৈবচ। বহুকাল পূর্বে, তখন বয়স অল্প, ঘরে কিংবা বাইরে খাতির করবার লোক নেই।- লেখা আরম্ভ করেছি। কিন্তু সে লেখা দূরে পৌছয় নি । আমার কাছে দেশের লোকের বা বিদেশের লোকের কোনো প্ৰত্যাশা ছিল না । পাঠক জমতে আরম্ভ করে নি তা বলা যায় না, কিন্তু পাঠকমণ্ডলী-নামক প্ৰকাণ্ড একটি শনিগ্ৰহ আমার জীবনকে তার উপগ্রহন্দলে ভরতি করবার জন্যে টান মারে নি । তখন মাসিকপত্র দুটি-চারটি, তার মধ্যে যারা প্ৰবলকণ্ঠশালী তারা ছিল আমার নিয়ত প্ৰতিকুল । সাপ্তাহিক যে-কয়টি ছিল তারা কেউ আমার প্রতি প্ৰসন্ন ছিল না । তাই আমার দায়িত্ব ছিল প্ৰধানত আমার নিজের কাছেই । তখন না ছিলেম আখ্যাত, না ছিলেম বিখ্যাত, ছিলেম প্ৰত্যাখ্যাত । তখন বাংলাদেশের নির্জন নদীর চরে ছিল আমার যাওয়া-আসা। সম্পূর্ণ নিজের মনেই লিখে যে তুম, শোনবার লোক কেউ ছিল না তা নয়, ছিল দুটি-চারিটি । আমার মন ছিল পাখি ; তার না ছিল খাচা, না ছিল পায়ে শিকল- না ছিল তার পরে শৌখিনের দাবি, না ছিল তার জন্যে প্ৰশংসার বাধা খোরাক । তার পর চল্লিশ বছর হয়ে গেল । এবার চলল সমুদ্রযাত্রা সুদীর্ঘ ; পরিচিত সঙ্গী কেবলমাত্র একজন, এলমহাস্ট, বাংলাভাষায় তার কান ছিল না। ডাঙার কোলাহল বহুদূরে । তার উপর শরীর হল অসুস্থ, তাতে ক’রেও সংসারের দায়িত্ব আরো অনেক দূরে দিলে সরিয়ে । বহুবৎসর পরে তাই ছুটি পাওয়া গেল, অল্পবয়সের হালকা জীবনের ছুটি । আমনি কলম আপনি ছুটলি কবিতার চেনা রাস্তায় । ক্যাবিনে বসেও কবিতা লেখা চলে, এইবারে তার প্রথম আবিষ্কার । ক্যাবিনের খাচা বাইরের খাচা, সেটা ভুলতে বেশিক্ষণ লাগে না। যদি মনের মধ্যে পর্দা উঠে যায়, যদি ছুটির আকাশ থেকে হুহু করে হাওয়া ছুটে আসে । সেদিন শুধু কাব্য লিখি নি, গদ্যও লিখেছি ; সেই কবিতা আর গদ্য ছিল ভাইবোন, সগোত্র । এইবারে সেই ছুটি ঠিক মিলল না । মন ডানা নড়াতে গিয়ে দেখে ডানার উপরে কর্তব্যের ফরমাশ গট হয়ে চেপে বসে ; মনের আপনি খেয়ালের জায়গা খুব সংকীর্ণ। দূর হোকগে- বোঝাটাকে নিয়ে দেশদেশান্তরে আর বয়ে বেড়াতে পারি নে। কাল ডেকের উপর কেদারায় বসে মনে মনে বললুম, বিশ্বের কাছে আমার দায়িত্ব আছে। অন্তত কিছুক্ষণের জন্যে এই কথাটা ভুলব । তাই একটা ছোটো কালো খাতা নিয়ে বুকে পড়া গেল, গৌড়জনকে নিরবধি মধু খাওয়াব সংকল্প করে নয়, অদৃষ্টের কাছে আজও ছুটির পাওনা দাবি করতে পারি। এইটি প্রমাণ করবার জন্যে । তার পরে সন্ধে হয়ে এল। দূরে দেখা যায় তটরেখা, নীল পাহাড় ঝাপসা হয়ে এসেছে । হাওয়া উঠেছে, সমুদ্রে দিয়েছে ঢেউ । ডেকের উপর আলো জ্বলল। আবার একবার কলম হাতে খাতা খুললুম। -বিচিত্রা, মাঘ ১৩৩৪ তে হি নো দিবসাঃ অপরাহুে আর-একটা কবিতা লিখে বসেছি । কর্তব্য হাতে না থাকলে অকাজের প্রাদুর্ভাব কিরকম প্রবল হয় তারই এটা প্ৰমাণ। ওয়ার্ডসওয়ার্থ যখন কর্তব্য সম্বন্ধে ওড়া লিখেছিলেন তখন তাকে যদি মুলোর চাষ করতে হত, তা হলে অতবড়ো দুর্ঘটনা ঘটত না । পোড়ো বাড়িতেই ভূতে বাসা করে । -বিচিত্রা, ফায়ুন ১৩৩৪ br8