পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৭৩১

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


গ্ৰন্থপরিচয় OS ইহা উল্লেখযোগ্য যে, পূর্ব-অনুচ্ছেদে প্রথম-সংস্করণ পরিশেষের যে ছয়টি কবিতার উল্লেখ, তাহার কোনোটি গদ্যছন্দে লেখা নয় ; মিলা-দুট হইলেও ছন্দ-ছুটি নয় ; ছন্দের কলামাত্রিক সাধু রীতিই অনুসৃত । পুনশ্চ কাব্যে পূর্বাবধি এরূপ ‘মিলা-হীন অথচ ছন্দোবদ্ধ কবিতা আছে আরো আটটিকোমলগান্ধার (পৃ ২৫৩), শালিখ (পৃ ২৭৯), অস্থানে (পৃ ৩১৪), ঘরছাড়া (পৃ ৩১৫), ছুটি (পৃ. ৩২৯), গানের বাসা (পৃ. ৩৩০), পয়লা আশ্বিন (পৃ. ৩৩১) প্ৰত্যেকটি দলমাত্রিক ছড়ার ছন্দে ; তাহা ছাড়া, মৃত্যু (পৃ ৩১৭) পূর্ববৎ (পূর্বে পরিশেষ কাব্যে যেমন) কলামাত্রিক সাধু রীতিতে । যথার্থ গদ্যছন্দে লেখা কবির প্রথম কবিতা সম্ভবত শিশুতীর্থ (পৃ ৩১৯) । ধূর্জটিপ্ৰসাদ মুখোপাধ্যায়কে লিখিত একটি পত্রে রবীন্দ্রনাথ পুনশ্চ কাব্যের রচনারীতি সম্বন্ধে যে আলোচনা করেন। অতঃপর নিম্নে তাহা মুদ্রিত হইল গানের আলাপের সঙ্গে পুনশ্চ কাব্যগ্রন্থের গদ্যিকারীতির যে তুলনা করেছ সেটা মন্দ হয় নি । কেননা, আলাপের মধ্যে তালটা বঁাধনছাড়া হয়েও আত্মবিস্মৃত হয় না। অর্থাৎ, বাইরে থাকে না। মৃদঙ্গর বােল, কিন্তু নিজের অঙ্গের মধ্যেই থাকে চলবার একটা ওজন । কিন্তু সংগীতের সঙ্গে কাব্যের একটা জায়গায় মিল নেই । সংগীতের সমস্তটাই অনির্বাচনীয় । কাব্যে বচনীয়তা আছে সে কথা বলা বাহুল্য । অনির্বচনীয়তা সেইটোকেই বেষ্টন করে হিল্লোলিত হতে থাকে, পৃথিবীর চার দিকে বায়ুমণ্ডলের মতো । এ-পর্যন্ত বচনের সঙ্গে অনির্বাচনের, বিষয়ের সঙ্গে রসের গাঠ বেঁধে দিয়েছে ছন্দ । পরস্পরকে বলিয়ে নিয়েছে ‘যদেতৎ হৃদয়ং মম তদন্তু হৃদয়ং তব । বাক এবং অবাক বাধা পড়েছে ছন্দের মাল্যবন্ধনে। এই বাক এবং অবাকের একান্ত মিলনেই কাব্য। বিবাহিত জীবনে যেমন কাব্যেও তেমনি মাঝে মাঝে বিরোধ বাধে, উভয়ের মাঝখানে ফাক পড়ে যায়, ছন্দও তখন জোড় মেলাতে পারে না । সেটাকেই বলি আক্ষেপের বিষয় । বাসরঘরে এক শয্যায় দুই পক্ষ দুই দিকে মুখ ফিরিয়ে থাকার মতোই সেটা শোচনীয় । তার চেয়ে আরো শোচনীয় যখন “এক কন্যে না খেয়ে বাপের বাড়ি যান । যথা পরিমিত খাদ্যবস্তুর প্রয়োজন আছে। এ কথা অজীর্ণরোগীকেও স্বীকার করতে হয় । কোনো কোনো কাব্যে বাগদেবী স্কুলখাদ্যাভাবে ছায়ার মতো হয়ে পড়েন । সেটাকে আধ্যাত্মিকতার লক্ষণ বলে উল্লাস না করে আধিভৌতিকতার অভাব বলে বিমর্ষ হওয়াই উচিত । পুনশ্চ কাব্যগ্রন্থে আধিভৌতিককে সমাদর করে ভোজে বসানো হয়েছে। যেন জামাই ষষ্ঠী । এ মানুষটা পুরুষ । একে সোনার ঘড়ির চেন পরালেও অলংকৃত করা হয় না। তা হােক, পাশেই আছেন কাকন-পরা অর্ধবিগুষ্ঠিতা মাধুরী, তিনি তার শিল্পসমৃদ্ধ ব্যজনিকার আন্দোলনে এই ভোজের মধ্যে অমরাবতীর মৃদুমন্দ হাওয়ার আভাস এনে দিচ্ছেন । নিজের রচনা নিয়ে অহংকার করছি মনে করে আমাকে হঠাৎ সদুপদেশ দিতে বোসো না । আমি যে কীর্তিটা করেছি। তার মূল্য নিয়ে কথা হচ্ছে না ; তার যেটি আদর্শ এই চিঠিতে তারই আলোচনা চলছে। বাক্ষ্যমাণ কাব্যে গদ্যটি মাংসপেশল পুরুষ বলেই কিছু প্রাধান্য যদি নিয়ে থাকে। তবু তার কলাবতী বধু দরজার আধাখোলা অবকাশ দিয়ে উকি মারছে, তার সেই ছায়াবৃত কটাক্ষ-সহযোগে সমস্ত দৃশ্যটি রসিকদের উপভোগ্য হবে বলেই ভরসা। করেছিলুম। এর মধ্যে ছন্দ নেই বললে অত্যুক্তি হবে, ছন্দ আছে বললেও সেটাকে বলব স্পর্ধা । তবে কী বললে ঠিক হবে ব্যাখ্যা করি । ব্যাখ্যা করব কাব্যরস দিয়েই । বিবাহসভায় চন্দনচচিত বর-কনে টােপর মাথায় আল্পনা-আঁকা পিড়ির উপর বসেছে । পুরুত পড়ে চলেছে মন্ত্র, ও দিকে আকাশ থেকে আসছে। শাহানা রাগিণীতে শানাইয়ের সংগীত । এমন অবস্থায় উভয়ের যে বিবাহ চলেছে সেটা নিঃসন্দিগ্ধ সুস্পষ্ট । নিশ্চিত-ছন্দ-ওয়ালা কাব্যে সেই শানাই-বাজনা সেই মন্ত্র-পড়া লেগেই আছে । তার সঙ্গে আছে লাল চেলি, বেনারসির জোড়, ফুলের মালা, ঝাড়-লষ্ঠানের রোশনাই । সাধারণত যাকে কাব্য বলি সেটা হচ্ছে বচন-অনির্বাচনের সদ্যোমিলনের পরিভূষিত উৎসব। অনুষ্ঠানে যা যা দরকার সযত্নে তা সংগ্ৰহ করা হয়েছে। কিন্তু তার পরে ? অনুষ্ঠান তো বারো মাস চলবে না। তাই বলেই তো নীরবিত শাহানা সংগীতের সঙ্গে সঙ্গেই বরবধুর