পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৭৩২

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


ASO রবীন্দ্ৰ-রচনাবলী মহাশূন্যে অন্তর্ধান কেউ প্রত্যাশা করে না। বিবাহ অনুষ্ঠানটা সমাপ্ত হল, কিন্তু বিবাহটা তো রইল, যদি না কোনো মানসিক বা সামাজিক উপানিপাত ঘটে । এখন থেকে শাহানা রাগিণীটা অশ্রদ্রুত বাজবোঁ । এমন-কি, মাঝে মাঝে তার সঙ্গে বেসুরো নিখাদে অত্যন্তশ্রুত কড়া সুরও না মেশা অস্বাভাবিক, সুতরাং একেবারে না মেশা প্রার্থনীয় নয়। চেলি বেনরসিটা তোলা রইল, আবার কোনো অনুষ্ঠানের দিনে কাজে লাগবে। সপ্তপদীর বা চতুৰ্দশপদীর পদক্ষেপটা প্রতিদিন মানায় না। তাই বলেই প্রাত্যহিক পদক্ষেপটা অস্থানে পড়ে বিপদজনক হবেই এমন আশঙ্কা করি নে। এমন-কি, বাম দিক থেকে রুনুকুনু মলের আওয়াজ গোলমালের মধ্যেও কানে আসে। তবু মোটের উপর বেশভুষাটা হল আটপৌরে । অনুষ্ঠানের বাধা রীতি থেকে ছাড়া পেয়ে একটা সুবিধে হল এই যে, উভয়ের মিলনের মধ্যে দিয়ে সংসারযাত্রার বৈচিত্র্য সহজ রূপ নিয়ে স্থূল সূক্ষ্ম নানা ভাবে দেখা দিতে লাগল। যুগলমিলন নেই, অথচ সংসারযাত্রা আছে, এমনও ঘটে । কিন্তু, সেটা লক্ষ্মীছাড়া । যেন খবুরে-কাগজি সাহিত্য । কিন্তু, যে, সংসারটা প্রতিদিনের অথচ সেই প্রতিদিনকেই লক্ষ্মীশ্ৰী চিরদিনের করে তুলছে, যাকে চিরন্তনের পরিচয় দেবার জন্যে বিশেষ বৈঠকখানায় অলংকৃত আয়োজন করতে হয় না, তাঁকে কাব্যশ্রেণীতেই গণ্য করি । অথচ চেহারায় সে গদ্যের মতো হতেও পারে। তার মধ্যে বেসুর আছে, প্ৰতিবাদ আছে, নানাপ্রকার বিমিশ্রতা আছে, সেইজন্যেই চরিত্ৰশক্তি আছে। যেমন কর্ণের চরিত্ৰশক্তি যুধিষ্ঠিরের চেয়ে অনেক বড়ো । অথচ একরকম শিশুমতি আছে যারা ধর্মরাজের কাহিনী শুনে অশ্রুবিগলিত হয় । রামচন্দ্ৰ নামটার উল্লেখ করলুম না, সে কেবল লোকভয়ে । কিন্তু, আমার দৃঢ় বিশ্বাস আদিকবি বাল্মীকি রামচন্দ্ৰকে ভূমিকাপত্তন-স্বরূপে খাড়া করেছিলেন তার অসবৰ্ণতায় লক্ষ্মণের চরিত্রকে উজ্জ্বল করে আঁকবার জন্যেই, এমন-কি, হনুমানের চরিত্রকেও বাদ দেওয়া চলবে না । কিন্তু, সেই একঘেয়ে ভূমিকাটা অত্যন্ত বেশি রঙফলানো চওড়া বলেই লোকে ঐটের দিকে তাকিয়ে হায় হায় করে। ভবভূতি তা করেন নি। তিনি রামচন্দ্রের চরিত্রকে আশ্রদ্ধেয় করবার জন্যেই কবিজনে৷াচিত কৌশলে উত্তররামচরিত রচনা করেছিলেন । তিনি সীতাকে দাড় করিয়েছেন রামভদ্রের প্রতি প্ৰবল গঞ্জনারীপে । ঐ দেখো, কী কথা বলতে কী কথা এসে পড়ল । আমার বক্তব্য ছিল এই, কাব্যকে বেড়াভাঙা গদ্যের ক্ষেত্রে স্ত্রীস্বাধীনতা দেওয়া যায় যদি তা হলে সাহিত্যসংসারের আলংকারিক অংশটা হাল্কা হয়ে তার বৈচিত্রের দিক, তার চরিত্রের দিক, অনেকটা খোলা জায়গা পায়- কাব্য জোরে পা ফেলে চলতে পারে । সেটা সযত্বে নোচে চলার চেয়ে সব সময়ে যে নিন্দনীয় তা নয় । নাচের আসরের বাইরে আছে এই উচু-নিচু বিচিত্র বৃহৎ জগৎ, রূঢ় অথচ মনোহর ; সেখানে জোরে চলাটাই মানায় ভালো, কখনো ঘাসের উপর, কখনো কাকরের উপর দিয়ে । রোসো । নাচের কথাটা যখন উঠল ওটাকে সেরে নেওয়া যাক । নাচের জন্য বিশেষ সময় বিশেষ কায়দা চাই । চারি দিক বেষ্টন করে আলোটা মালাটা দিয়ে তার চালচিত্র খাড়া না করলে মানানসই হয় না । কিন্তু, এমন মেয়ে দেখা যায় যার সহজ চলনের মধ্যেই বিনা ছন্দের ছন্দ আছে । কবিরা সেই অনায়াসের চলন দেখেই নানা উপমা খুঁজে বেড়ায় । সে মেয়ের চলনটাই কাব্য, তাতে নাচের তাল নাই বা লাগল ; তার সঙ্গে মৃদঙ্গের বোল দিতে গেলে বিপত্তি ঘটবে। তখন মৃদঙ্গকে দোষ দেব, না তার চলনকে ? সেই চলন নদীর ঘাট থেকে আরম্ভ করে রান্নাঘর বাসরঘর পর্যন্ত । তার জন্যে মাল-মসলা বাছাই করে বিশেষ ঠাট বানাতে হয় না । গদ্যকাব্যেরও এই দশা । সে নাচে না, সে চলে । সে সহজে চলে বলেই তার গতি সর্বত্র । সেই গতিভঙ্গি আবাধা । ভিড়ের ছোওয়া বাচিয়ে পোশাকি-শাড়ির প্রান্ত-তুলে-ধরা আধ-ঘোমটা টানা সাবধান চাল তার নয় । এই গেল আমার পুনশ্চ কাব্যগ্রন্থের কৈফিয়ত । আরো-একটা পুনশ্চ নাচের আসরে নাট্যাচাৰ্য হয়ে বসব না। এমন পণ করি নি । কেবলমাত্র কাব্যের অধিকারকে বাড়াব মনে করেই একটা দিকের বেড়ায় গোট বসিয়েছি। এবারকার মতো আমার কাজ ঐ পর্যন্ত । সময় তো বেশি নেই। এর পরে আবার কোন খেয়াল আসবে বলতে পারি নে। যারা দৈবদুর্যোগে মনে করবেন গদ্যে কাব্যরচনা সহজ তারা