পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড) - সুলভ বিশ্বভারতী.pdf/৭৩৮

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


SV রবীন্দ্র-রচনাবলী ধ্যানের সিদ্ধ কেটে মহাকবি ভাবীকালের সামগ্ৰীতে কিরকম কৌশলে হস্তক্ষেপ করতেন তার আর-একটি প্রমাণ দেব। কর্ষণজীবী এবং আকর্ষণজীবী এই দুই জাতীয় সভ্যতার মধ্যে একটা বিষম দ্বন্দ্ব আছে, এ সম্বন্ধে বন্ধুমহলে আমি প্রায়ই আলাপ করে থাকি। কৃষিকাজ থেকে হরণের কাজে মানুষকে টেনে নিয়ে কলিযুগ। কৃষিপল্পীকে কেবলই উজাড় করে দিচ্ছে। তা ছাড়া শোষণজীবী সভ্যতার ক্ষুধাতৃষ্ণা দ্বেষহিংসা বিলাসবিভ্ৰম সুশিক্ষিত রাক্ষসেরই মতো । আমার মুখের এই বচনটি কবি তার রূপকের বুলিতে লুকিয়ে আত্মসাৎ করেছেন, সেটা প্ৰণিধান করলেই বোঝা যায়। নবদুর্বদলশ্যাম রামচন্দ্রের বক্ষসংলগ্ন সীতাকে স্বর্ণপুরীর অধীশ্বর দশানন হরণ করে নিয়েছিল সেটা কি সেকালের কথা, না একালের ? সেটা কি ত্ৰেতাযুগের ঋষির কথা, না। আমার মতো কলিযুগের কবির কথা ? তখনো কি সোনার খনির মালেকরা নবদুর্বাদলবিলাসী কৃষকদের কুঁটি ধরে টান দিয়েছিল ? আরো একটা কথা মনে রাখতে হবে । কৃষী-যে দানবীয় লোভের টানেই আত্মবিস্মৃত হচ্ছে, ত্ৰেতাযুগে তারই বৃত্তান্তটি গা-ঢাকা দিয়ে বলবার জন্যেই সোনার মায়ামৃগের বর্ণনা আছে । আজকের দিনের রাক্ষসের মায়ামৃগের লোভেই তো আজকের দিনের সীতা তার হাতে ধরা পড়ছে ; নইলে গ্রামের পঞ্চবটচ্ছায়াশীতল কুটির ছেড়ে চাষীরা টিটাগড়ের চটকলে মরতে আসবে কেন । বাল্মীকির পক্ষে এ সমস্তই পরবতী কালের, অর্থাৎ পরস্ব । বারোয়ারির প্রবীণামণ্ডলীর কাছে। এ কথা বলে ভালো করলেম না । সীতাচারিত প্রভৃতি পুণ্যকথাসম্বন্ধে তারা আমাকে অশ্রদ্ধাবান বলেই সন্দেহ করেন । এটা আমার দোষ নয়, তাদেরও দোষ বলতে পারি নে, বিধাতা তাদের এইরকমই বুদ্ধি দিয়েছেন । বোধ করি সেটা আমার সঙ্গে বারে বারে কৌতুক করবার জন্যেই। পুণ্যশ্লোক বাল্মীকির প্রতি কলঙ্ক আরোপ করলুম বলে পুনর্বার হয়তো তারা আমাকে একঘরে করবার চেষ্টা করবেন । ভরসার কথা আমার দলের লোক আছেন, কৃত্তিবাস নামে আর-এক বাঙালি কবি । এই প্রসঙ্গে একটা কথা মনে উঠল । আধুনিক সমস্যা বলে কোনো পদার্থ নেই, মানুষের সব গুরুতর সমস্যাই চিরকালের । রত্নাকরের গল্পটার মধ্যে তারই প্ৰমাণ পাই । রত্নাকর গোড়ায় ছিলেন দসু্য, তার পরে দসু্যুবৃত্তি ছেড়ে ভক্ত হলেন রামের। অর্থাৎ ধর্ষণবিদ্যার প্রভাব এড়িয়ে কর্ষণবিদ্যায় যখন দীক্ষা নিলেন, তখনি সুন্দরের আশীর্বাদে তঁর বীণা বাজল । এই তত্ত্বটা তখনকার দিনেও লোকের মনে জেগেছে। এককালে যিনি দাসু্য ছিলেন তিনিই যখন কবি হলেন, তখনই আরণ্যকদের হাতে স্বৰ্ণলঙ্কার পরাভাবের বাণী তার কণ্ঠে এমন জোরের সঙ্গে বেজেছিল । হঠাৎ মনে হতে পারে রামায়ণটা রূপক কথা । বিশেষত যখন দেখি রাম রাবণ দুই নামের দুই বিপরীত অর্থ। রাম হল আরাম, শান্তি ; রাবণ হল চীৎকার, অশান্তি । একটিতে নবান্ধুরের মাধুর্য, পল্লবের মর্মর, আর-একটিতে শানবাধানো রাস্তার উপর দিয়ে দৈত্যরথের বীভৎস শৃঙ্গাধবনি । কিন্তু তৎসত্ত্বেও রামায়ণ রূপক নয়, আমার রক্তকরবীর পালাটিও রূপাকনাট্য নয় । রামায়ণ মুখ্যত মানুষের সুখদুঃখ বিরহ-মিলন ভালোমন্দ নিয়ে বিরোধের কথা ; মানবের মহিমা উজ্জ্বল করে ধরবার জন্যেই চিত্রপটে দানবের পটভূমিকা। এই বিরোধ এক দিকে ব্যক্তিগত মানুষের, আরেক দিকে শ্রেণীগত মানুষের ; রাম ও রাবণ এক দিকে দুই মানুষের ব্যক্তিগত রূপ, আরেক দিকে মানুষের দুই শ্রেণীগত রূপ । আমার নাটকও একই কালে ব্যক্তিগত মানুষের আর মানুষগত শ্রেণীর । শ্রোতারা যদি কবির পরামর্শ নিতে অবজ্ঞা না করেন তা হলে আমি বলি শ্রেণীর কথাটা ভুলে যান । এইটি মনে রাখুন, রক্তকরবীর সমস্ত পালাটি "নন্দিনী’ বলে একটি মানবীর ছবি । চারিদিকের পীড়নের ভিতর দিয়ে তার আত্মপ্ৰকাশ । ফোয়ারা যেমন সংকীর্ণতার পীড়নে হাসিতে অশ্রুতে কলধবনিতে উর্ধের্ব উচ্ছসিত হয়ে ওঠে, তেমনি । সেই ছবির দিকেই যদি সম্পূর্ণ করে তাকিয়ে দেখেন তা হলে হয়তো কিছু রস পেতে পারেন । নয়তো রক্তকরবীর পাপড়ির আড়ালে অর্থ খুঁজতে গিয়ে যদি অনৰ্থ ঘটে তা হলে তার দায় কবির নয় । নাটকের মধ্যেই কবি আভাস দিয়েছে যে, মাটি খুঁড়ে যে-পাতালে খনিজ ধন খোজা হয়