প্রধান মেনু খুলুন

পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (ষোড়শ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৩৫৯

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


শান্তিনিকেতন Ꮼ©Ꭳ পারলেই সে বন্ধ থেকেও এবং বন্ধ থাকাতেই পরিপূর্ণ সার্থকতার মধ্যে মুক্তিলাভ করে | আমাদের জীবনের বীণাতেও কর্মের সরু মোট তারগুলি ততক্ষণ কেবলমাত্র বন্ধন যতক্ষণ তাদের সত্যের নিয়মে ধ্রুব করে না বেঁধে তুলতে পারি। কিন্তু, তাই বলে এই তারগুলিকে খুলে ফেলে দিয়ে শূন্যতার মধ্যে, ব্যর্থতার মধ্যে, নিক্রিয়তালাভকে মুক্তিলাভ বলে না। তাই বলছিলুম কর্মকে ত্যাগ করা নয়, কিন্তু আমাদের প্রতিদিনের কর্মকেই চিরদিনের স্বরে ক্রমশ বেঁধে তোলবার সাধনাই হচ্ছে সত্যের সাধনা, ধর্মের সাধনা। এই সাধনারই মন্ত্র হচ্ছে : যদ্যৎ কর্ম প্রকুবীত তদব্ৰহ্মণি সমৰ্পয়েৎ। যে যে কৰ্ম করবে সমস্তই ব্রহ্মকে সমর্পণ করবে। অর্থাৎ, সমস্ত কর্মের দ্বারা আত্ম। আপনাকে ব্রহ্মে নিবেদন করতে থাকবে । অনন্তের কাছে নিত্য এই নিবেদন করাই আত্মার গান, এই হচ্ছে আত্মার মুক্তি। তখন কী আনন্দ যখন সকল কর্মই ব্রহ্মের সঙ্গে যোগের পথ, কর্ম যখন আমাদের নিজের প্রবৃত্তির কাছেই ফিরে ফিরে না আসে, কর্মে যখন আমাদের আত্মসমর্পণ প্রতিদিন একান্ত হয়ে ওঠে— সেই পূর্ণতা, সেই মুক্তি, সেই স্বর্গ – তখন সংসারই তো আনন্দনিকেতন। কর্মের মধ্যে মানুষের এই-যে বিরাট আত্মপ্রকাশ, অনস্তের কাছে তার এই-যে নিরস্তর আত্মনিবেদন, ঘরের কোণে বসে একে কে অবজ্ঞা করতে চায় ! সমস্ত মানুষে মিলে রৌদ্রে বৃষ্টিতে দাড়িয়ে কালে কালে মানবমাহায্যের যে অভ্ৰভেদী মন্দির রচনা করছে কে মনে করে সেই স্থমহং স্বষ্টিব্যাপার থেকে স্বদূরে পালিয়ে গিয়ে নিভৃতে বসে আপনার মনে কোনো-একটা ভাবরসসম্ভোগই মানুষের সঙ্গে ভগবানের মিলন, এবং সেই সাধনাই ধর্মের চরম সাধনা ! ওরে উদাসীন, ওরে আপনার মাদকতায় বিভোর বিহ্বল সন্ন্যাসী, এখনই শুনতে কি পাচ্ছ না ইতিহাসের স্বদূরপ্রসারিত ক্ষেত্রে মচুন্যত্বের প্রশস্ত রাজপথে মানবাত্মা চলেছে, চলেছে মেঘমন্দ্রগর্জনে আপনার কর্মের বিজয়রথে, চলেছে বিশ্বের মধ্যে আপনার অধিকারকে বিস্তীর্ণ করতে। তার সেই আকাশে আন্দোলিত জয়পতাকার সম্মুখে পর্বতের প্রস্তররাশি বিদীর্ণ হয়ে গিয়ে পথ ছেড়ে দিচ্ছে ; বন-জঙ্গলের ঘনছায়াচ্ছন্ন জটিল চক্রাস্ত স্বর্যালোকের আঘাতে কুহেলিকার মতো তার সম্মুখে দেখতে দেখতে কোথায় অস্তধান করছে ; অস্থখ অস্বাস্থ্য অব্যবস্থা পদে পদে পিছিয়ে গিয়ে প্রতিদিন তাকে স্থান ছেড়ে দিচ্ছে ; অজ্ঞতার বাধাকে সে পরাভূত করছে, অন্ধতার অন্ধকারকে সে বিদীর্ণ করে ফেলছে। তার চারি দিকে দেখতে দেখতে ঐসম্পদ কাব্যকলা জ্ঞানধর্মের আনন্দলোক উদঘাটিত হয়ে যাচ্ছে ।