প্রধান মেনু খুলুন

পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (ষোড়শ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৪৭৪

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


৪৬৬ রবীন্দ্র-রচনাবলী জাগিয়ে তোলে কেন, তখন বুঝি যে প্রিয়তম জাগলেন না— তারই জাগার অপেক্ষায় যে এত আয়োজন । f তাই আমি আমার অন্তরাত্মাকে যা-কিছু এনে দিচ্ছি সে সব পরিহার করছে। সে বলছে, এ নয়, এ নয়, এ নয়— আমি আমার প্রিয়তমকে চাই। আমি তাকে না পেয়েই তো পাপে লুটোচ্ছি, আমি ক্ষুধাতৃষ্ণার এই দাহ সহ করছি, আমি চারি দিকে আমার অশাস্ত প্রবৃত্তি নিয়ে দক্ষ্যবৃত্তি করে বেড়াচ্ছি। র্যাকে পেলে সব মিলবে তাকে পাওয়া হয় নি বলেই এত আঘাত দিচ্ছি। যদি তাকে পেতুম বলতুম, “আমার হয়ে গেছে। আমার দিনের পর দিন, জীবনের পর জীবন ভরে গেল । সমস্ত সৌন্দর্যের মাঝখানে যেদিন সেই সুন্দরকে দেখলুম, সমস্ত মাধুর্যের ভিতরে যেদিন সেই মধুরকে পেলুম, সেদিন আমার মাধুর্যের পরিচয় দেব কিসে। মাধুর্যে বিগলিত হয়ে কি পরিচয় দেব। না। মাধুর্ষের পরিচয় মাধুর্যে নয়, মাধুর্যের পরিচয় বীর্যে। সেদিন মৃত্যুকে স্বীকার করে পরিচয় দেব। বলব, প্রিয়তম হে, মরব তোমার জন্য। আমার আর শোক নেই, ক্ষুদ্রতা নেই, ক্ষতি নেই। প্রাণের মায় আর আমার রইল না— বলো-না তুমি, প্রাণকে তোমার কোন কাজে দিতে হবে। তোমাকে পেলে ধুলোয় লুটিয়ে কেঁদে বেড়াব তা নয়, কেবল মধুর রসের গান করব তা নয় গো। যেদিন বলতে পারব যিনি মধুর পরম মধুর, যিনি সুন্দর পরম সুন্দর, তিনি আমার প্রিয়তম, তিনি আমায় স্পর্শ করেছেন সেদিন আনন্দে দুর্গম পথে সমস্ত কণ্টককে পায়ে দলে চলে যাব । সেদিন জানব যে কর্মে কোনো ক্লাস্তি থাকবে না, ত্যাগে কোথাও কৃপণতা থাকবে না। কোনো বাধাকে বাধা বলে মানব না। মৃত্যু সেদিন সামনে দাড়ালে তাকে বিদ্রুপ করে চলে যাব। সেদিন বুঝব তার সঙ্গে আমার মিলন হয়েছে। মানুষকে সেই মিলন পেতেই হবে। দেখতে হবে দুঃখকে মৃত্যুকে সে ভয় করে না। স্পর্ধা করে বীরত্ব করলে সে বীরত্ব টেকে না— জগৎ-ভরা আনন্দ যেদিন অস্তরে স্বধাম্রোতে বয়ে যাবে সেদিন মানুষের সমস্ত মনুষ্যত্ব সরল হবে, তার কর্ম সহজ হবে, তার ত্যাগ সহজ হবে । সেদিন মানুষ বীর। সেদিন ইচ্ছা করে সে বিপদকে বরণ করবে। প্রিয়তম যে জাগবেন সে খবর পাব কেমন করে। গান যে বেজে উঠবে। কী গান বাজবে । সে তো সহজ গান নয়, সে যে রুদ্রবীণার গান। সেই গান শুনে মানুষ বলে উঠবে, সৌন্দর্যে অভিভূত হব বলে এ পৃথিবীতে জন্মাই নি, সৌন্দর্যের স্বধারসে পেয়ালা ভরে তাকে নিঃশেষে পান করে মৃত্যুকে উপেক্ষ করে চলে যাব। মাধুর্যের প্রকাশ কেবল ললিতকলায় নয়। এই সৌন্দর্যমুধার মধ্যে বীর্যের আগুন রয়েছে ; মানুষ যেদিন এই সৌন্দর্যস্বধা পান করবে সেদিন দুঃখের মাথার উপরে সে দাড়াবে, আগুনে