প্রধান মেনু খুলুন

পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (ষোড়শ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৫২১

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


গ্রন্থপরিচয় । $ ○ Sや শালবনের ছায়ায়, খোলা জানলার কাছে বাইরে একটা তালগাছ খাড়া দাড়িয়ে ; তারই পাতাগুলোর কম্পমান ছায়া সঙ্গে নিয়ে রোদন্থর এসে পড়েছে আমার দেয়ালের উপর ; জামের ডালে বসে ঘুঘু ডাকছে সমস্ত দুপুরবেলা ; নদীর ধার দিয়ে একটা ছায়াবীথি চলে গেছে ; কুড়চি ফুলে ছেয়ে গেছে গাছ ; বাতাবি নেবুর ফুলের গন্ধে বাতাস ঘন হয়ে উঠেছে ; জারুল পলাশ মাদারে চলেছে প্রতিযোগিতা ; সজনে ফুলের ঝুরি দুলছে হাওয়ায় ; অশথগাছের পাতাগুলো ঝিলমিল ঝিলমিল করছে— আমার জানলার কাছ পর্যন্ত উঠেছে চামেলি লতা । নদীতে নেবেছে একটি ছোটো ঘাট, লাল পাথরে বাধানো, তারই এক পাশে একটি চাপার গাছ। একটির বেশি ঘর নেই। শোবার খাট দেয়ালের গহবরের মধ্যে ঠেলে দেওয়া যায়। ঘরে একটিমাত্র আছে আরাম-কেদারা ; মেঝেতে ঘন লাল রঙের জাজিম পাতা ; দেয়াল বসন্তী রঙের, তাতে ঘোর কালো রেখার পাড় আঁকা। ঘরের পুব দিকে একটুখানি বারান্দা ; সুর্যোদয়ের আগেই সেইখানে চুপ করে গিয়ে বসব, আর খাবার সময় হলে লীলমনি সেইখানে খাবার এনে দেবে। একজন কেউ থাকবে যার গলা খুব মিষ্টি, যে আপন-মনে গান গাইতে ভালোবাসে। পাশের কুটিরে তার বাসা ; যখন খুশি সে গান করবে, আমার ঘরের থেকে শুনতে পাব । তার স্বামী ভালোমানুষ এবং বুদ্ধিমান ; আমার চিঠিপত্র লিখে দেয়, অবকাশকালে সাহিত্য-আলোচনা করে, এবং ঠাট্টা করলে ঠাট্ট বুঝতে পারে এবং যথোচিত হাসে । নদীর উপরে দুটি সাকো থাকবে, নাম দিতে পারব জোড়াসাকো ; সেই সাকোর দুই প্রাস্ত বেয়ে জুই বেল রজনীগন্ধা রক্তকরবী । নদীর মাঝে-মাঝে গভীর জল, সেইখানে ভাসছে রাজহাস ; আর চালু নদীতটে চীরে বেড়াচ্ছে আমার পাটল রঙের গাইগোরু তার বাছুর নিয়ে । শাক-সব্জির খেত আছে, বিঘে-দুইয়েক জমিতে ধানও কিছু হয়। খাওয়াদাওয়া নিরামিষ ঘরে তোলা মাখন দই ছানা ক্ষীর ; কুকারে যা রাধা যেতে পারে তাই যথেষ্ট, রান্নাঘর নেই। থাক এই পর্যন্ত । বাইরের দিকে চেয়ে মনে পড়ছে আছি বর্লিনে বড়োলোক সেজে, বড়ো কথা বলতে হবে ; বড়ো খ্যাতির বোঝা বয়ে চলতে হবে দিনের পর দিন ; জগৎ-জোড়া সব সমস্ত রয়েছে তর্জনী তুলে,তার জবাব চাই। ও দিকে ভারতসাগরের তীরে অপেক্ষা করে আছে বিশ্বভারতী ; তার অনেক দাবি, অনেক দায় ; ভিক্ষা করতে হবে দেশে দেশাস্তরে। অতএব থাক্ আমার স্ট ডিয়ো । কতদিনই বা বাচব ! ইতিমধ্যে কর্তব্য করতে করতে ঘোরা যাক রেলে চড়ে, মোটরে চড়ে, জাহাজে চড়ে, ব্যোমযানে চ’ড়ে, সভ্যভব্য হয়ে । অতএব আর সময় নেই। ইতি ১৮ অগস্ট ১৯৩০ —পত্রসংখ্যা ৩৬ । চিঠিপত্র ৩