পাতা:রাজর্ষি-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.djvu/৫০

এই পাতাটিকে বৈধকরণ করা হয়েছে। পাতাটিতে কোনো প্রকার ভুল পেলে তা ঠিক করুন বা জানান।
৪৯
রাজর্ষি

 রঘুপতি মেঘগম্ভীর স্বরে কহিলেন, “তবে তোরা দেখিবি? আয়, আমার সঙ্গে আয়। অনেক দূর হতে অনেক আশা করিয়া তোরা ঠাকরুনকে দর্শন করিতে আসিয়াছিস— চল্‌, একবার মন্দিরে চল্‌।”

 সকলে সভয়ে মন্দিরের প্রাঙ্গণে আসিয়া সমবেত হইল। মন্দিরের দ্বার রুদ্ধ ছিল; রঘুপতি ধীরে ধীরে দ্বার খুলিয়া দিলেন।

 কিয়ৎক্ষণ কাহারও মুখে বাক্যস্ফূর্তি হইল না। প্রতিমার মুখ দেখা যাইতেছে না, প্রতিমার পশ্চাদ্ভাগ দর্শকের দিকে স্থাপিত। মা বিমুখ হইয়াছেন। সহসা জনতার মধ্য হইতে ক্রন্দনধ্বনি উঠিল, “একবার ফিরে দাঁড়া মা! আমরা কী অপরাধ করেছি?” চারি দিকে “মা কোথায়”, “মা কোথায়” রব উঠিল। প্রতিমা পাষাণ বলিয়াই ফিরিল না। অনেকে মূর্ছা গেল। ছেলেরা কিছু না বুঝিয়া কাঁদিয়া উঠিল। বৃদ্ধেরা মাতৃহারা শিশুসন্তানের মতো কাঁদিতে লাগিল, “মা, ওমা!” স্ত্রীলোকদের ঘোমটা খুলিয়া গেল, অঞ্চল খসিয়া পড়িল, তাহারা বক্ষে করাঘাত করিতে লাগিল। যুবকেরা কম্পিত ঊর্ধ্বস্বরে বলিতে লাগিল “মা, তোকে আমরা ফিরিয়ে আনব; তোকে আমরা ছাড়ব না।” একজন পাগল গাহিয়া উঠিল—

“মা আমার পাষাণের মেয়ে
সন্তানে দেখলি নে চেয়ে।”

মন্দিরের দ্বারে দাঁড়াইয়া সমস্ত রাজ্য যেন “মা মা” করিয়া বিলাপ করিতে লাগিল, কিন্তু প্রতিমা ফিরিল না। মধ্যাহ্নের সূর্য প্রখর হইয়া উঠিল, প্রাঙ্গণে উপবাসী জনতার বিলাপ থামিল না।

 তখন জয়সিংহ কম্পিত পদে আসিয়া রঘুপতিকে কহিলেন, “প্রভু আমি কি একটি কথাও কহিতে পাইব না?”

 রঘুপতি কহিলেন, “না, একটি কথাও না।”

 জয়সিংহ কহিলেন, “সন্দেহের কি কোনো কারণ নাই?”