পাতা:রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ.djvu/১৮২

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
১৪০
রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ।

বর্ত্তমান মেটকাফ হল নিৰ্ম্মিত হইলে ১৮৪৪ সালে সেই হলে উঠিয়া আসে। ডেপুটী লাইব্রেরিয়ানের পদ হইতে প্যারীচাঁদ নিজের বিদ্যাবুদ্ধি ও কাৰ্য্যদক্ষতা প্রভৃতির গুণে একাদিক্ৰমে লাইব্রেরিয়ান, সেক্রেটারি ও কিউরেটারের পদে উন্নীত হইয়াছিলেন এবং ঐ পদেই চিরদিন প্রতিষ্ঠিত ছিলেন।

 অন্য লোক হইলে কেবলমাত্র অর্থোপার্জ্জনের জন্য এ পদকে ব্যবহার করিত; কিন্তু প্যারীচাঁদ লাইব্রেরিটী হাতে পাইয়া আপনার জ্ঞানভাণ্ডার পূর্ণ করিতে প্রবৃত্ত হইলেন; এবং নানা বিষয়ে গবেষণা আরম্ভ করিলেন। বালক কাল হইতেই তাঁহার যেমন জ্ঞানলাভ-স্পৃহা ছিল, তেমনি জ্ঞানবিতরণ-স্পৃহাও ছিল, ইহা পূর্বেই প্রদর্শিত হইয়াছে। তাঁহার সেই জ্ঞান-বিতরণ-স্পৃহা এখনও বলবতী দৃষ্ট হইল। তিনি একদিকে যেমন জ্ঞান-সঞ্চয় করিতে লাগিলেন, অপরদিকে সংবাদপত্রাদিতে লিখিয়া সেই জ্ঞান বিতরণ করিতে লাগিলেন। প্রথমে তিনি তাঁহার বন্ধু রসিককৃষ্ণ মল্লিকের সহিত মিলিয়া “জ্ঞানান্বেষণ” পত্রিকা সম্পাদন করিতেন। তৎপরে রামগোপাল ঘোষ প্রভৃতি একত্র হইয়া যখন ‘বেঙ্গল স্পেক্টেটর” নামে এক সংবাদপত্র বাহির করেন, সে সময়ে তিনি তাঁহার একজন নিয়মিত লেখক ছিলেন। এতদ্ভিন্ন বেঙ্গল হরকর, ইংলিসম্যান, কলিকাতা রিভিউ প্রভৃতিতে সৰ্ব্বদা লিখিতেন।

 কিন্তু একটা বিশেষ কার্য্যের জন্য বঙ্গসাহিত্যে তিনি চিরস্মরণীয় হইয়া রহিয়াছেন। একদিকে পণ্ডিতবর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগয়, অপরদিকে খ্যাতনামা অক্ষয়কুমার দত্ত, এই উভয় যুগপ্রবর্ত্তক মহাপুরুষের প্রভাবে বঙ্গভাষা যখন নবজীবন লাভ করিল, তখন তাহা সংস্কৃত-বহুল হইয়া দাঁড়াইল। বিদ্যাসাগর মহাশয় ও অক্ষয় বাবু উভয়ে সংস্কৃত-ভাষাভিজ্ঞ ও সংস্কৃত-ভাষানুরাগী লোক ছিলেন; সুতরাং তাঁহারা বাঙ্গালাকে যে পরিচ্ছদ পরাইলেন তাহা সংস্কৃতের অলঙ্কারে পরিপূর্ণ হইল। অনেকে এরূপ ভাষাতে প্রীতিলাভ করিলেন বটে, কিন্তু অধিকাংশ লোকের নিকট, বিশেষতঃ সংস্কৃতানতিজ্ঞ শিক্ষিত ব্যক্তিদিগের নিকট, ইহা অস্বাভাবিক, কঠিন ও দুৰ্ব্বোধ বলিয়া বোধ হইতে লাগিল। সে সময়ে পাঁচজন ইংরাজীশিক্ষিত লোক কলিকাতার কোনও বৈঠকখানাতে একত্র বসিলেই এই সংস্কৃত-বহুল ভাষা লইয়া অনেক হাসাহাসি হইত। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের সংবাদ প্রভাকরের ন্যার পত্রেও সেই উপহাস বিদ্রুপ প্রকাশিত হইত। অক্ষয় বাবু যখন সংস্কৃতকে আশ্রয় করিয়া, “জিগীষা” “জিজীবিষা", প্রভৃতি শব্দ প্রণয়ন করিলেন, তখন আমরা কলিকাতার যে কোনও