পাতা:রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ.djvu/১৮৩

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
১৪১
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ।

শিক্ষিত লোকের বাটীতে যাইতাম শুনিতে পাইতাম “জিগীষা” “জিজীবিষা” প্রভৃতি শব্দের সহিত চিট্‌টীমিষা’ শব্দ যোগ করিয়া হাসাহাসি হইতেছে।

 যখন বিদ্যাসাগর মহাশয় ও অক্ষয় বাবুর সংস্কৃত বহুল বাঙ্গালার ভার দুৰ্ব্বহ বোধ হইতে লাগিল, তখন ১৮৫৭ কি ৫৮ সালে, “মাসিক পত্রিকা” নামে এক ক্ষুদ্রকায় পত্রিকা দেখা দিল। প্যারীচাঁদ মিত্র ও রাধানাথ শিকার এই পত্র সম্পাদন করিতেন। ইহা লোকপ্রচলিত সহজ বাঙ্গালাতে লিখিত হইত। স্ত্রীলোকে বালকে যেন বুঝিতে পারে এই লক্ষ্য রাখিয়া লেখকগণ লিখিতেন। এই জন্য মাসিক পত্রিকা পড়িতে সকলে এক প্রকার আনন্দ অনুভব করিত। কখন পত্রিকা আসে তজ্জন্য উৎসুক হইয়া থাকিত। ইহারই কিছুদিন পরে টেকচাঁদ ঠাকুরের “আলালের ঘরের দুলাল” প্রকাশিত হইল। প্যারীচাঁদ মিত্রই এই টেকচাঁদ ঠাকুর। আলালের ঘরের দুলাল একখানি উপন্যাস। কুমারখালীর হরিনাথ মজুমদারের প্রণীত “বিজরবসন্ত” ও টেকচাঁদ ঠাকুরের “আলালের ঘরের দুলাল” বাঙ্গালীর প্রথম উপন্যাস। তন্মধ্যে বিজয়বসন্ত তৎকাল-প্রচলিত বিশুদ্ধ সংস্কৃত-বহুল বাঙ্গালাতে লিখিত। কিন্তু আলালের ঘরের ছলাল, বঙ্গসাহিত্যে এক নবযুগ আনয়ন করিল। এই পুস্তকের ভাষার নাম ‘আলালী ভাষা’ হইল। তখন আমরা কোনও লোকের ভাষাকে গাম্ভীর্য্যে হীন দেখিলেই তাহাকে আলালী ভাষা বলিতাম। এই আলালী ভাষার উৎকৃষ্ট নমুনা ‘হুতমের নক্সা”। যাঁহার ইচ্ছা হয় পাঠ করিয়া দেখবেন তাহা কেমন সরস, মিষ্ট্র ও হৃদয়গ্রাহী। এই আলালী ভাষার সৃষ্টি হইতে বঙ্গসাহিতোর গতি ফিরিয়া গেল। ভাষা সম্পূর্ণ আলালী রহিল না বটে কিন্তু, ঈশ্বরচন্দ্রী রহিল না, বঙ্কিমী হইয়া দাঁড়াইল। এজন্য আমার পূজ্যপাদ মাতুল, সোমপ্রকাশ সম্পাদক, খ্যাতনামা দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ মহাশয় সোমপ্রকাশে কতই শোক করিলেন। কিন্তু আমার বোধ হয় ভালই হইয়াছে; জীবন্ত মানুষ ও ভাষা যত কাছাকাছি থাকে, ততই ভাল।

 যাহা হউক প্যারীচাঁদ মিত্র বঙ্গসাহিত্যে এই যুগান্তর আনয়ন করিলেন। তৎপরে তিনি ‘অভেদী” “যৎকিঞ্চিৎ, “বামাতোষিণী” “রামারঞ্জিকা", “আধ্যাত্মিকা” প্রভৃতি অনেকগুলি উৎকৃষ্ট বাঙ্গালা গ্রন্থ প্রণয়ন করিয়াছেন। তাহাতে কিন্তু আলালী ভাষা ব্যবহার করেন নাই, বরং বঙ্কিমী ভাষাই ব্যবহার করিয়াছেন।