পাতা:রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ.djvu/১৮৬

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
১৪৪
রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ।

রাধানাথ শিকদার।

 ইনিওঁ ডিরোজিও বৃক্ষের একটা উৎকৃষ্ট ফল। ১৮১৩ খ্ৰীষ্টাব্দে আশ্বিন মাসে কলিকাতা যোড়াশাকোর অন্তঃপাতী শিকদার-পাড়া নামক স্থানে রাধানাথের জন্ম হয়। ইহার পিতার নাম তিতুরাম শিকদার। ইনি ভিন্ন তিতুরামের আর এক পুত্র ও তিন কন্যা ছিলেন। রাধানাথ সকলের বড়। এই শিকদারগণ ব্রাহ্মণ বংশসম্ভত এবং কলিকাতার অতি প্রাচীন অধিবাসী। মুসলমান নবাবদিগের সময়ে ইহাদের পূর্বপুরুষগণ বংশ-পরম্পর ক্রমে শিকদার বা পুলিস কমিশনরের কাজ করিতেন। ইহাদের অধীনে বহুসংখ্যক লাঠিয়াল, পাইক ও সৈনিক প্রভৃতি থাকিত। ইঁহারা দুর্বৃত্ত ব্যক্তি দিগকে ধৃত করিতে, কয়েদ করিতে ও সাজা দিতে পারিতেন। অনেক স্থলে এই শক্তির অপব্যবহার হইত, এবং যাহা লোকের রক্ষার উদ্দেশ্যে দেওয়া হইয়াছিল, তাহা লোকের পীড়নের জন্য ব্যবহৃত হইত। এমন কি এরূপ জনশ্রুতি আছে যে, কলিকাতা ইংরাজদিগের অধিকৃত হওয়ার পরেও যখন ফৌজদারী কার্য্যের ভরে মুরশিদাবাদের নবাবের হস্তে ছিল, তখনও ইহারা শিকদারের কাজ করিতেন। পরে কোনও এক বিশেষ স্থলে একজনের প্রতি অতিশয় উৎপীড়ন হওয়াতে সে দিকে ইংরাজদিগের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়; এবং সেই আন্দোলনে ইহাদের হস্ত হইতে শক্তি অপহৃত হয়।

 রাধানাথ যে সময়ে জন্মগ্রহণ করেন, তখন তাঁহার পিতা বা তাঁহার বংশের কেহ শিকদারের কাজ করিতেন না। তিতুরাম আপনার জ্যেষ্ঠ পুত্র রাধানাথ ও কনিষ্ঠ পুত্ৰ শ্ৰীনাথকে কিছুদিন পাঠশালে ও ফিরিঙ্গী কমল বসুর স্কুলে পড়াইয়া হিন্দু কালেজে ভৰ্ত্তি করিয়া দেন। ১৮২৪ সালে তিনি হিন্দু কালেজে প্রবিষ্ট হন এবং সাত বৎসর দশমাস কাল তথায় অধ্যয়ন করেন। ইহার একটা উৎকৃষ্ট অভ্যাস ছিল; দৈনিক লিপি লিখিতেন। তাহা হইতে সে সময়কার অনেক বিবরণ জানিতে পারা যায়। ইহার কনিষ্ঠ সহোদর শ্রীনাথ শিকদার রামতনু লাহিড়ী মহাশয়ের সহপাঠী ও তাঁহার প্রতি বিশেষ অনুরক্ত ছিলেন। তাঁহার সহিত লাহিড়ী মহাশয় সৰ্ব্বদা ইহাদের বাড়ীতে বেড়াইতে যাইতেন, তখন রাধানাথের জননী পুত্রনিৰ্ব্বিশেষে তাঁহাকে যত্ন করিতেন। সেই অকৃত্রিম স্নেহ ও সদাশয়তার স্মৃতি চিরদিন লাহিড়ী মহাশয়ের মনে মুদ্রিত ছিল।