পাতা:রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ.djvu/২১৭

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
১৭৩
সপ্তম পরিচ্ছেদ।

আশয়ে সস্ত্রীক পলাইয়া মিশনারিদিগের ভবনে আশ্রয় গ্রহণ করে। তাহাকে মিশনারিদিগের হাত হইতে ছিড়িয়া লইবার জন্য তাহার পিতা বিস্তর চেষ্টা করেন। ডফ সাহেব সে পথে অন্তরায় স্বরূপ দণ্ডায়মান হন। ইহা লইয়া হিন্দু সমাজ মধ্যে ঘোরতর আন্দোলন উপস্থিত হয়। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, অক্ষয়কুমার দত্ত প্রভৃতি ব্ৰাহ্মসমাজের অগ্রণীগণও এই আবর্ত্তে পড়িয়া খ্ৰীষ্টীয়-বিরোধীদলের অগ্রণী হইয়া দাঁড়ান। কলিকাতার ভদ্র গৃহস্থগণ এক মহাসভা করিয়া অনেক টাকা সংগ্রহ করেন। হিন্দু-হিতার্থী বিদ্যালয় নামে একটা বিদ্যালয় স্থাপিত হয়; এবং কিছুদিন মহা উৎসাহে তাহার কাজ চলিতে থাকে। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয় তাহার প্রথম সম্পাদক নিযুক্ত হন। তাঁহার মুখে শুনিয়াছি যে উক্ত বিদ্যালয়ের জন্য সংগৃহীত টাকা যাঁহাদের হস্তে গচ্ছিত ছিল, তাহদের কারবারে ক্ষতি হওয়াতে ঐ সমুদয় টাকা নষ্ট হয়, তাহাতেই কয়েক বৎসর পরে ঐ বিদ্যালয় উঠিয়া যায়।

 একদিকে হিন্দুহিতার্থী বিদ্যালয় স্থাপিত হইল, অপরদিকে ব্রাহ্মসমাজের মুখপাত্র তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা খ্ৰীষ্টীয়ধৰ্ম্মের প্রতি গোলাগুলি বর্ষণ করিতে আরম্ভ করিলেন। খ্ৰীষ্টানগণ ও ব্রহ্মসমাজের ধৰ্ম্ম বিশ্বাসকে ভিত্তিহীন বলিয়া আক্রমণ করিতে লাগিলেন। তাহাতে তত্ত্ববোধিনী আপনার অবলম্বিত ধৰ্ম্মকে বেদান্তধৰ্ম্ম ও বেদকে তাহার অভ্রান্ত ভিত্তি বলিয়া প্রচার করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। ইহা হইতে বেদ অভ্রান্ত ঈশ্বরদত্ত গ্রন্থ হইতে পারে কি না? এই বিচার ব্রাহ্মসমাজের ভিতর ও বাহিরে উপস্থিত হইল। ভিতরে অক্ষয়কুমার দত্ত প্রভৃতি ইহার প্রতিবাদ উপস্থিত করিলেন; এবং বাহির হইতে রামগোপাল ঘোষ প্রমুখ শিক্ষিত ব্যক্তিগণ ব্রাহ্মদিগকে কপট ও ভণ্ড বলিয়া বিদ্রুপ করিতে লাগিলেন।

 এই সকল সামাজিক আন্দোলনের মধ্যে লাহিড়ী মহাশয়ের পরিবারে কয়েকটা ঘটনা ঘটে। প্রথম, লাহিড়ী মহাশয়ের জ্যৈষ্ঠ কেশবচন্দ্রের মৃত্যু। কনিষ্ঠ ভ্রাত রাধাবিলাস তাঁহার অগ্ৰেই গিয়াছিলেন, তৎপরে যখন কেশবের যাইবার সময় উপস্থিত হইল, তখন কৃষ্ণনগরের লোক সাধু পিতা রামকৃষ্ণের ভাব দেখিয়া অবাক হইয়া গেল। এরূপ শুনিতে পাই কেশবচন্দ্রকে সজ্ঞানে গঙ্গাযাত্রা করান হইয়াছিল। যখম তাঁহাকে গঙ্গাতে লইয়া যাওয়া হয়, কেশবচন্দ্র পিতার পদধূলি-প্রার্থী হইলেন। তদনুসারে রামকৃষ্ণ ধীর গম্ভীরভাবে অগ্রসর হইয়া পুত্রের মস্তকে নিজের পদধূলি দিয়া বিদায় করি