পাতা:রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ.djvu/২২৬

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
১৮২
রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ।

তাঁহার শিষ্যদলের মনে চিরদিন পূর্ণমাত্রায় কার্য্য করিয়াছে। তাঁহারা চিরদিন মানবের স্বাধীনতাকে পবিত্র পদার্থ মনে করিয়া আসিয়াছেন; কোনও কারণেই তাহাতে হস্তার্পণ করিতে প্রবৃত্ত হন নাই। লাহিড়ী মহাশয়ের যৌবনের পূর্ণ উৎসাহের মধ্যে সেই ভাব পূর্ণমাত্রায় কাৰ্য্য করিতেছিল। তিনি শিক্ষকরূপে বালকদিগের মধ্যে বসিতেন বটে, কিন্তু অনেক সময়ে তাহাদের সহিত বয়স্যের ন্যায় ব্যবহার করিতেন। স্বীয় গুরু ডিরোজিওর ন্যায় কোনও একটা বিষয়ে তর্ক্ক তুলিয়া স্বাধীন ও অসংকুচিত ভাবে তাহাদিগকে স্বীয় স্বীয় মত ব্যক্ত করিতে দিতেন। নিজে পুৰ্ব্বপক্ষ লইয়া তাহাদিগকে উত্তরপক্ষ অবলম্বন করিতে উৎসাহিত করিতেন। কেবল যে মানবের চিন্তার স্বাধীনতাকে আদর করিতেন বলিয়া এইরূপ করিতেন, তাহা নহে, চিরজীবন তাঁহার এপ্রকার বাল-সুলভ বিনয় ছিল যে, জীবনের শেষদিন পর্য্যন্ত তিনি মনে করিতেন বালকের নিকটেও কিছু শিখিবার আছে। আমরা বয়সে তাঁহার পুত্রের সমান, অথচ অনেক সময় আমাদের একটী সামান্য মত বা উক্তি এরূপ সন্ত্রমের সহিত শুনিতেন যে আমাদের কথা কহিতে লজ্জা হইত। পূৰ্ব্বপুরুষগণ উপদেশ দিয়া গিয়াছেন, “বালাদপি সুভাষিতং গ্রাহ্যং” ভাল কথা বালকের মুখ হইতেও শুনিতে হইবে। লাহিড়ী মহাশয় কাজে তাহাই করিতেন। কোনও একটা প্রসঙ্গ উত্থাপিত করিয়া কোন বালক কি বলে, তাহা মনোযোগ পূর্ব্বক শ্রবণ করিতেন; এবং কাহারও মুখে কোনও একটা ভাল কথা শুনিলে আনন্দিত হইয়া উঠিতেন। “একথা তুমি কোথায় পাইলে? এরূপ কথা তোমাকে কে শুনাইল!” বলিয়া তাহাকে অস্থির করিরা তুলিতেন। যদি শুনিতেন যে সে নিজগৃহে গুরুজনের মুখে শুনিয়াছে, অমনি বলিতেন “হবে না, কিরূপ বংশের ছেলে।” চিরদিন বংশ-মৰ্য্যাদার প্রতি তাঁহার বিশেষ দৃষ্টি ছিল যাহা হউক এইরূপ স্বাধীন বিচারের ভাব প্রবৰ্ত্তিত হওয়াতে কৃষ্ণনগরের শিক্ষিত যুবকদলের মধ্যে এক নবভাব দেখা দিল। তাহারা স্বাধীন ভাবে সমুদয় সামাজিক বিষয়ের বিচারে প্রবৃত্ত হইল।

 এই সময়ে কিছুদিন ধরিয়া কৃষ্ণনগরে একটা বিষয়ের বিচার চলিতেছিল— তাহা বিধবা-বিবাহ। অনেকের সংস্কার আছে, পণ্ডিতবর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ই সৰ্ব্ব-প্রথমে বঙ্গসমাজে বিধবা-বিবাহের বিচার উপস্থিত করেন। কিন্তু বোধ হয় তাহা ঠিক নহে। ১৮০২ সাল হইতে রামগোপাল ঘোষ প্রমুখ ডিরোজিও