পাতা:রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ.djvu/২৩৯

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
১৯৫
অষ্টম পরিচ্ছেদ।

মহাশয়ের কর্ণগোচর হইলে তিনি মৰ্ম্মাস্তিক লজ্জা পাইলেন। ঐ বালকের ৰাক্যগুলি তাহার অন্তরে শেলসম বিদ্ধ হইল। বাক্য ও কার্য্যের একতা যাহার জীবনের মহামন্ত্র ছিল, তাহার পক্ষে এই ব্যঙ্গোক্তি কি ক্লেশকর হইবার সম্ভাবনা! এই ঘটনা হইতেই উপবীত পরিত্যাগের সংকল্প তাঁহার মনে উপস্থিত হয়।

 দ্বিতীয়;—১৮৫১ সালের পূজার ছুটীর সময় লাহিড়ী মহাশয় নৌকাযোগে কতিপয় বন্ধুসহ গাজিপুরে গমন করিতেছিলেন। তাঁহার প্রিয়বন্ধু রামগোপাল ঘোষ তখন গাজিপুরে বাস করিতেছিলেন। তাঁহার নিমন্ত্রণে, তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিবার জন্যই, তাঁহারা গমন করিতেছিলেন। পথিমধ্যে নৌকার মাল্লাদিগের দ্বারাই পাকাদি কার্য্য করাইয়া আহারাদি চলিতেছিল। একদিন সহচরদিগের মধ্যে একজন কৌতুক করিয়া বলিলেন—“এদিকে ত মাল্লাদের হাতে খাইতেছি, অথচ পৈতাটা রাখিয়া ব্ৰহ্মণ্য দেখাইতেছি, কি ভণ্ডামীই করিতেছি!” বাক্যগুলি কৌতুকচ্ছলে কথিত হইল বটে, কিন্তু তাহা লাহিড়ী মহাশরের চিত্তে বিষম গ্লানি উপস্থিত করিল। তিনি তৎপূৰ্ব্বে আপনার উপবীতটী নৌকার ছত্রীতে ঝুলাইয়া রাখিয়াছিলেন; তাহা আর গ্রহণ করিলেন না।

 উভয় বিবরণের মধ্যে কোনও বিবাদ দৃষ্ট হইতেছে না। ইহা সম্ভব যে গাজিপুর যাত্রার পূৰ্ব্বে তিনি জননীর সাম্বৎসরিক শ্রাদ্ধক্রিয়া সম্পন্ন করিবার জন্য কৃষ্ণনগরে গমন করেন। সেখানে পূৰ্ব্বোক্ত বালকটীর বিদ্রুপোক্তি শুনিতে পান। তাহা হইতেই উপবীত পরিত্যাগের সংকল্প তাঁহার অন্তরে, উদিত হয়। তৎপরে গাজিপুর যাত্রাকালের ঘটনাটী ঘটে তাহাতে সেই সংকল্পকে দৃঢ়ীভূত করে। এরূপ একটা গুরুতর পরিবর্তন যে একদিনে ঘটিয়াছিল, তাহা মনে হয় না। তাই জীবনের অনেক দিনের সংগ্রামের ফল। আরও অনেকের জীবনে এই প্রকার ভাবেই এইরূপ পরিবর্ত্তন ঘটিয়াছে। সুতরাং ইহার জীবনেও সেই প্রকার ঘটিয়া থাকিবে তাহাতে আর বিচিত্র কি?

 যাহা হউক তিনি যখন উপবীত পরিত্যাগ করিয়া বৰ্দ্ধমানে প্রতিনিবৃত্ত লইলেন, তখন এই ব্যাপার লইয়া তুমুল আন্দোলন উপস্থিত হইল। হিন্দুসমাজের লোকে দলবদ্ধ হইয়া তাঁহার ধোপা নাপিত বন্ধ করিল; দাসদাসীগণ তাঁহাকে পরিত্যাগ করিল। তাঁহার দ্বিতীয় পুত্র নবকুমার তখন শিশু,