পাতা:রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ.djvu/২৪৭

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
২০১
অষ্টম পরিচ্ছেদ।

মহোৎসাহে উদার, আধ্যাত্মিক, একেশ্বরবাদের মহানিনাদে তত্ত্ববোধিনীর প্রবন্ধ সকলকে পূর্ণ করিতেছেন।

 ইহার পরেও অক্ষয় বাবু কয়েক বৎসর কার্যাক্ষেত্রে দণ্ডায়মান ছিলেন। মধ্যে নৰ্ম্মাল বিদ্যালয় স্থাপিত হইলে কিছুদিনের জন্য তাহার শিক্ষকতা করিয়াছিলেন বটে, কিন্তু তাঁহার প্রিয় তত্ত্ববোধিনীর সংশ্ৰব একেবারে পরিত্যাগ করেন নাই। অবশেষে ১৮৫৫ সালের আষাঢ় মাসে সন্ধ্যার পর এক দিন ব্রাহ্মসমাজের উপাসনাতে উপস্থিত আছেন, এমন সময়ে হঠাৎ মূৰ্ছিত হইয়া পড়িয়া যান। তখন অনেক যত্নে তাঁহার চৈতন্য সম্পাদিত হইল বটে, কিন্তু দুই দিবস পরে একদিন তত্ত্ববোধিনীর প্রবন্ধ লিখিতেছেন এমন সময়ে মস্তিষ্কের এক প্রকার অভূতপূৰ্ব্ব জ্বালা হওয়ায় লেখনী ত্যাগ করিতে বাধ্য হইলেন। তদবধি সে লেখনী আর ধারণ করিতে পারেন নাই।

 আশ্চৰ্য্য জ্ঞানপূহা! আশ্চৰ্য্য কার্য্যশক্তি! ইহার পরে এক প্রকার জীবন্মৃত অবস্থাতে থাকিয়াও তিনি অনেক গ্রন্থ রচনা করিয়াছেন। অধিক কি তাঁহার “ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়” নামক সুবিখ্যাত ও পাণ্ডিত্যপূর্ণ গ্রন্থ এই অবস্থাতেই সংকলিত। তাঁহার মুখে শুনিয়াছি তিনি প্রাতঃকালে, সুস্নিগ্ধ সময়ে শয্যাতে শয়ন করিয়া কোনও দিন এক ঘণ্টা কোনও দিন দেড় ঘণ্টা করিয়া মুখে মুখে বলিতেন, এবং কেহ লিখিয়া লইত, এইরূপ করিয়া এ সকল মহাগ্ৰন্থ সংকলিত হইয়াছিল।

 জীবনের অবসান কালে তিনি বালি গ্রামের গঙ্গাতীরবর্ত্তী এক উদ্যানবাটীতে থাকিয়া এইরূপে গ্ৰন্থ রচনা করিতেন; এবং অবশিষ্ট কাল উদ্ভিদতত্ত্বের আলোচনা ও সমাগত ব্যক্তিদিগের সহিত জ্ঞানানুশীলনে কাটাইতেন। সেখানে বাঙ্গালা ১২৯৩ বা ইং ১৮৮৬ সালের ১৪ই জ্যৈষ্ঠ তাঁহার দেহান্ত হয়।

 এদিকে যে ১৮৫২ সালে লাহিড়ী মহাশয় উত্তরপাড়াতে প্রতিষ্ঠিত হইলেন, সেই সময়ে ব্রিটিশ ইণ্ডিয়ান এসোসিএশনের স্থাপন, বঙ্গসাহিত্যের বিকাশ, তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার অভ্যুদ্যয় ও ব্রাহ্মসমাজের মত-বিপ্লব কেবলমাত্র এই সকলই যে বঙ্গসমাজকে আন্দোলিত করিতেছিল তাহা নহে, আর একটা বিশেষ কারণে তখন কলিকাতা সমাজে ঘোর আন্দোলন উপস্থিত হইয়াছিল। তাঁহার কিঞ্চিৎ বিবরণ ও যে শক্তিশালী পুরুষ তাঁহার নেতা হইয়াছিলেন, তাঁহার জীবনেরও কিঞ্চিৎ বিবরণ দেওয়া আবশ্যক বোধ হইতেছে।

 ২৬