পাতা:রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ.djvu/২৭

এই পাতাটিকে বৈধকরণ করা হয়েছে। পাতাটিতে কোনো প্রকার ভুল পেলে তা ঠিক করুন বা জানান।
প্রথম পরিচ্ছেদ ।

 নবাব সিরাজদ্দৌলা নিহত হইলে আলিবর্দী খাঁর জামাতা মীরজাফর তদীয় সিংহাসনে আরোহণ করিলেন। এই সময় হইতে ইংরাজগণ বাঙ্গালার প্রকৃত শাসনকর্ত্তা হইলেন বটে, কিন্তু কৃষ্ণচন্দ্রের দুঃখ সম্পূর্ণরূপে ঘুচিল না। মীরজাফর অল্পদিনের মধ্যেই স্বীয় পুত্র মীরণকে রাজকীয়পদে অভিষিক্ত করিয়া নিজে রাজকার্য্য হইতে অবসৃত হইলেন। ১৭৬৩ খ্রীষ্টাব্দে বজ্রাঘাতে মীরণের মৃত্যু হইল; এবং মীরজাফরের জামাতা মীরকাসিম নবাবের পদে প্রতিষ্ঠিত হইলেন। ইংরাজদিগের সহিত মীরকাসিমের মনোবাদ ঘটে। তিনি ইংরাজদিগের রাজধানী হইতে অপেক্ষাকৃত দূরে থাকিবার আশয়ে মুঙ্গেরে স্বীয় রাজধানী স্থাপন করেন। ইহার পরে তিনি দেশের মধ্যে যে যে বড় লোককে ইংরাজদের বন্ধু মনে করিতেন, বা ইংরাজদিগকে তুলিবার পক্ষে সহায় বলিয়া বিশ্বাস করিতেন, তাহাদিগকে ধরিয়া মুঙ্গেরের দুর্গে বন্দী ও হত্যা করিতে প্রবৃত্ত হন। তদনুসারে কৃষ্ণচন্দ্র ও তাঁহার জ্যেষ্ঠ পুত্র শিবচন্দ্রকে মুঙ্গেরের দুর্গে কিছু দিন বন্দী করিয়া রাখেন। ইংরাজদিগের ভয়ে হঠাৎ মুঙ্গের ছাড়িয়া পলায়ন করা আবশ্যক না হইলে, মীরকাসিম বোধ হয় সপুত্র কৃষ্ণচন্দ্রকেও হত্যা করিতেন। কিন্তু ইংরাজেরা আসিয়া পড়াতে পিতাপুৎত্রে সে যাত্রা রক্ষা পাইয়াছিলেন।

 ১৭৬৫ খ্রীষ্টাব্দে ইংরাজগণ দিল্লীর সম্রাট সাহ আলমের নিকট বাঙ্গালা বিহার ও উড়িষ্যা এই তিন প্রদেশের দেওয়ানী সনন্দ প্রাপ্ত হইয়া রাজস্বের উন্নতি বিধানে মনোযোগী হন। কিন্তু তাঁহাদের অনভিজ্ঞতাবশতঃ রাজস্ব সংক্রান্ত সমুদয় কার্য্য ঘোর বিশৃঙ্খলার মধ্যে পড়িয়া গেল। কি জানি কিরূপ দাঁড়ায় এই ভয়ে জমিদারগণ প্রজাকুলের নিকট স্বীয় স্বীয় বাকি প্রাপ্য আদায় করিয়া লইতে লাগিলেন। অনেক প্রজা নিঃস্ব হইয়া গেল। ইহার উপরে ১৭৬৮ ও ১৭৬৯ এই দুই বৎসর অনাবৃষ্টি হইয়া শস্যের সম্পূর্ণ ক্ষতি করিল। তাহার ফলস্বরূপ দেশে ভয়ানক মন্বন্তর উপস্থিত হইল। এরূপ দুর্ভিক্ষ এদেশে আর হয় নাই। ১২৭৬ বঙ্গাব্দে ঘটিয়াছিল বলিয়া এই দুর্ভিক্ষ “ছিয়াত্তুরে মন্বন্তর” নামে চিরদিন বাঙ্গালীর মনে মুদ্রিত হইয়া রহিয়াছে। সেই ভয়ানক মহামারীর বিশেষ বর্ণনা এখানে দেওয়া নিষ্প্রেয়াজন। এইমাত্র বলিলেই যথেষ্ট হইবে যে ১৭৭০ সালের জানুয়ারী হইতে আগষ্ট পর্য্যন্ত এই নয়মাসের মধ্যে সমগ্র বঙ্গদেশে প্রায় এক কোটি লোকের এবং কেবলমাত্র কলিকাতা নগরে ১৫ই জুলাই হইতে ১৫ই সেপ্টেম্বরের মধ্যে ৭৬০০০ লোকের মৃত্যু হয়। এরূপ হৃদয়-বিদারক দৃশ্য কেহ কখনও দেখে নাই। পথে ঘাটে, হাটে বাজারে, খানা