পাতা:রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ.djvu/২৭৩

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
২২৩
নবম পরিচ্ছেদ।

রাখ।” তদুত্তরে তিনি বলিতেন —“মা, তোমার সব কথা শুনবো, কিন্তু এই গরীব প্রজাদের জন্যে যা করছি তাতে বাধা দিও না, ওরা ধনে প্রাণে সারা হলো, এ কাজ না করে আমি ঘুমাতে পারবে না।” কিন্তু এই অতিরিক্ত শ্রমের ফল এই হইত যে, যে পেট্রিয়টের কাজ সপ্তাহ ধরিয়া করিলে অপেক্ষাকৃত লঘু হইত, তাহা দুই দিনে সারিতে হইত, সুতরাং সে দুই দিন সমস্ত রাত্রি জাগরণ করিতে হইত। এই গুরুতর শ্রমে দেহ মন যখন ক্লান্ত হইয়া পড়িত, তখন শিক্ষিত ব্যক্তিদিগের তদানীন্তন প্রথানুসারে সুরা-বিষ পান করিয়া আপনার অবসন্ন দেহ মনকে সজাগ রাখিবার চেষ্টা করিতেন।

 এরূপ শুনিয়াছি যে ইহার কিছু পূৰ্ব্বে তাঁহার প্রথম পত্নীর মৃত্যু হয়। সেই শোকের অবস্থাতে তাঁহার নবপরিচিত ধনী বন্ধুগণ তাঁহাকে সুরাপান ও অন্যান্য নিন্দিত আমোদে লিপ্ত করিয়া তাঁহার শোকাপনোদনের চেষ্টা পান। তাহা হইতেই তাহার সৰ্ব্বজনপ্রশংসিত চরিত্রে কালির রেখা পড়ে; তাহা হইতেই তাঁহার পানাসক্তি প্রবল হয়। এই বিবরণ যখন শুনি, তখন চক্ষে জল আসে আর বলি—হায়! স্কচ কবি বরন্‌স লাঙ্গল ফেলিয়া যদি এডিনবরা নগরে না আসিতেন তাহা হইলে যেমন ভাল হইত, তেমনি আমাদের দরিদ্র ব্রাহ্মণের সন্তান হরিশের পদবৃদ্ধি যদি না হইত, তিনি যদি কলিকাতার ধনীদের আদরে ছেলে হইয়া না দাঁড়াইতেন, তবে বুঝি ভাল হইত। ধনীর কয়েকদিনের জন্য তাঁহাকে স্বন্ধে করিয়া নাচিয়া গেলেন, দিয়া গেলেন মদের বোতল ও দারুণ পীড়া। ক্ষতি যাহা হইবার হরিশের পরিবারবর্গের হইল; এবং সৰ্ব্বোপরি হতভাগিনী বঙ্গভূমির হইল। আমার দৃঢ় বিশ্বাস হরিশ্চন্দ্রের ন্যায় এমন বিমল হৃদয়ে, দেহ মন প্রাণ দিয়া, স্বদেশের সেবা অতি অল্প লোকেই করিয়াছে।

 না জানি নীলকরগণ কি জাতক্রোধই হইয়াছিলেন। হরিশের মৃত্যুর পরেও তাঁহাদের ক্রোধ থামিল না। যে আর্কিবল্ড হিলস্ তাঁহার নামে প্রথমে সুপ্রিম কোর্টে অভিযোগ উপস্থিত করিয়াছিলেন, তিনিই তদনন্তর তাঁহার বিধবা পত্নীকে প্রতিবাদীশ্রেণীগণ্য করিয়া আলিপুর কোর্টে দশ হাজার টাকার দাবী করিয়া, দেওয়ানী মোকদ্দমা চালাইতে অগ্রসর হইলেন। হিলসের পশ্চাতে নীলকরগণ ছিলেন, হরিশের বিধবার পশ্চাতে কেহই ছিল না। এদেশীয়দিগের মধ্যে সে একতা কোথায়? কাজেই বন্ধুদিগের পরামর্শে হরিশের বিধবাকে আপসে মিটাইতে হইল। কিন্তু তথাপি বাদীর খরচার হিসাবে এক হাজার টাকা দিবার জন্য অঙ্গীকার করিতে হইল। এই এক