পাতা:রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ.djvu/২৭৬

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
২২৬
রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ।

শিক্ষিত সমাজে ইংরাজী অভিনয়ের ধূম লাগিয়া গেল। রঙ্গালয়ের অভিনয় একটা বৃতিকের মধ্যে দাঁড়াইল। স্কুলের ছেলে ছোকরার স্বীয় স্বীয় দলে ছোট ছোট রকমে ম্যাকবেথ প্রভৃতির অভিনয় আরম্ভ করিল। কিন্তু ক্রমে ধনিগণ অনুভব করিলেন যে ইংরাজী নাটক অভিনয় করিলে সাধারণের প্রীতিকর হয় না। এই জন্য বাঙ্গালী নাটকের অভিনয়ের দিকে তাহাদের দৃষ্টি পড়িল। এই সময়ে সংস্কৃত কলেজের অন্যতম অধ্যাপক রামনারায়ণ তর্করত্ন মহাশর কোনও ধনি-প্রদত্ত পারিতোষিক লাভের উদ্দেশে “কুলীনকুল সৰ্ব্বস্ব” নামক এক নাটক রচনা করিয়াছিলেন। সুপ্রসিদ্ধ যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর মহাশয়ের প্ররোচনায় ওরিয়েণ্টাল থিয়েটারে একবার তাহার অভিনয় হয়। ইহাতেই দেশীর নাটক অভিনয়ের দ্বার খুলিয়া গেল। তৎপরে ১৮৫৭ সালে সিমুলীয়ার বিখ্যাত ধনী অশুতোষ দেব (ছাতু বাবু) উদ্যোগী হইয়া শকুন্তলাকে বাঙ্গালা নাটকাকারে পরিণত করিয়া অভিনর করাইলেন। তৎপরেই মহাভারতের অনুবাদক কালীপ্রসন্ন সিংহ মহোদয় নিজ ভবনে বেণীসংহার নাটকের অভিনয় করাইলেন; এবং কিছু দিন পরে মহাসমারোহে তাহার নিজের অনুবাদিত বিক্রমোর্ব্বশী নাটকের অভিনয় হইল। দেখিতে দেখিতে সহরে বাঙ্গালা নাটক অভিনয়ের প্রথা প্রবর্ত্তিত হইয়া গেল।

 এইসকল অভিনয় দেখিয়া পাইকপাড়ার রাজপরিবারের দুই ভাই, রাজা প্রতাপচন্দ্র ও ঈশ্বরচন্দ্রের এবং (মহারাজ) যতীন্দ্রমোহন ঠাকুরের মনে একটা দেশীয় রঙ্গালয় স্থাপনের সংকল্প জন্মিল। তাঁহারা তিন জনে পরামর্শ করিয়া বেলগাছিয়া নামক উদ্যানে এক নাট্যালয় স্থাপন করিলেন; এই নাট্যালয় বঙ্গসাহিত্যে এক নবযুগ আনিয়া দিবার পক্ষে উপায়-স্বরূপ হইল। ইহা অমর কবি মধুসূদনের সহিত আমাদের পরিচয় করাইয়া দিল। মাইকেল মধুসূদন দত্ত, ১৮৫৬ সালে মান্দ্রাজ হইতে ফিরিয়া আসিয়া তদানীন্তন কলিকাতার পুলিস কোর্টে কাজ করিতেছিলেন। কলিকাতার লোক তাঁহাকে চিনিত না। কেবল হিন্দুকালেজের কতিপয় সহাধ্যায়ী মাত্র তাঁহাকে চিনিতেন। বাবু গৌরদাস বসাক তাঁহাদের মধ্যে একজন। গৌরদাস বাবু তাঁহাকে নূতন নাট্যালয়ের উদ্যোগী ধনীদের সহিত পরিচিত করিয়া দেন। তাঁহারা ঐ নাট্যালয়ে ১৮৫৮ সালে সংস্কৃত রত্নাবলী নাটকের অনুবাদ করিয়া অভিনয় করিলেন। মধুসূদন তাঁহার ইংরাজী অনুবাদ করিয়া দিলেন। সেই ইংরাজী অনুবাদ দেখিয়াই মধুসূদনের বিদ্যাবুদ্ধির প্রতি রাজাদের নিরতিশয়