পাতা:রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ.djvu/২৭৯

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
২২৭
নবম পরিচ্ছেদ।

শ্রদ্ধা জন্মিল। মধুসূদন প্রাচীন সংস্কৃত নাটকের নিয়মবদ্ধ রীতি ত্যাগ পূৰ্ব্বক নুতন প্রণালীতে “শৰ্ম্মিষ্ঠা” নাটক রচনা করিলেন। তাহা সকলের হৃদয়-গ্রাহী হইল। মধুসূদনের প্রতিভার বিমল রশ্মি বঙ্গীয় সাহিত্যাকাশকে অপূৰ্ব্বরাগে অনুরঞ্জিত করিল। তাঁহার পদ্মাবতী, বুড়ো শালিকের ঘাড়ের রোঁ, একেই কি বলে সভ্যতা, কৃষ্ণকুমারী প্রভৃতি অপরাপর নাটক ক্রমে প্রণীত ও অভিনীত হইতে লাগিল।

 তাঁহার জীবনচরিতকার বলেন যে এই বেলগাছিয়া রঙ্গালয়ের সম্পর্ক হইতেই মধুসূদনের অমিত্রাক্ষর ছন্দ রচনার সূত্রপাত। তিনি নিজের প্রণীত কোন কোনও নাটকে ইংরাজ কবিদিগের অনুকরণে নায়ক-নায়িকার উক্তি প্রত্যুক্তিমধ্যে অমিত্রাক্ষর ছন্দে কবিতা রচনা করিয়া যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর মহাশয়ের নিকট পাঠ করেন। এই বিষয় লইয়া উক্ত ঠাকুর মহাশয়ের সহিত তাঁহার মতভেদ উপস্থিত হয়। ঠাকুর মহাশয় বলেন যে ফরাসি ভাষার ন্যায় বাঙ্গালা ভাষা অমিত্ৰাক্ষর ছন্দের অনুকুল নহে। মধুসূদন প্রতিবাদ করিয়া বলেন—“বাঙ্গালা ভাষা যে সংস্কৃত ভাষার কন্ঠ, তাহাতে অমিত্রাক্ষর ছন্দ প্রচুর পরিমাণে লক্ষিত হয়, বাঙ্গালাতে কেন হইবে না? আমি অমিত্রাক্ষরে কাব্য রচনা করিয়া দেখাইব।” এই বলিয়া তনি “তিলোত্তমা” রচনা করিতে বসেন; এবং অল্পকাল মধ্যেই তাহার কিয়দংশ লিখিয়া বন্ধুগণের হস্তে অর্পণ করেন। ১৮৬০ সালে “তিলোত্তম-সম্ভব” কাব্যের কিয়দংশ রাজেন্দ্রলাল মিত্র সম্পাদিত “বিবিধার্থ সংগ্রহ” নামক মাসিক পত্রে প্রকাশিত হয়। ইহার পরে তিন বৎসরের মধ্যেই মধুসূদনের অসাধারণ প্রতিভা দেখিতে দেখিতে প্রাতঃসূৰ্য্যের ন্যায় উঠিয়া যেন মাধ্যাহ্নিক রেখাকে অতিক্রম করিয়া গেল! তাঁহার ব্রজাঙ্গনা কাব্যমেঘনাদবধ প্রভৃতি প্রকাশিত হইলে তাঁহার কবিত্বখ্যাতি দেশমধ্যে ব্যাপ্ত হইল।

 বঙ্গসাহিত্য আকাশে মধুসূদন যখন উদিত হইলেন তথনও ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের প্রতিভার স্নিগ্ধ জ্যোতি তাহা হইতে বিলুপ্ত হয় নাই। কোথার আমরা গুপ্ত কবির রসিকতা ও চিত্তরঞ্জক ভাব সকলের মধ্যে নিমগ্ন ছিলাম, আর কোথায় আমাদেব চক্ষের সম্মুখে ধক্ ধক্ করিয়া কি প্রচণ্ড দীপ্তি উদিত হইল। বঙ্গসাহিত্যে সেই অপূৰ্ব্ব প্রদোষকালের কথা আমরা কখনই বিস্তৃত হইব না। সংস্কৃত কবি এক স্থানে বলিয়াছেনঃ—