পাতা:রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ.djvu/২৮০

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
২২৮
রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ।

ষাত্যেকতোস্তশিখরং পতিরোষধীনাং
আবিষ্কৃতারুণপুরঃসর একতোর্কঃ।

 একদিকে ওষধিপতি চন্দ্র অস্ত যাইতেছেন, অপরদিকে অরুণকে অগ্রসর করিয়া দিবাকর দেখা দিতেছেন।

 বঙ্গসাহিত্যজগতে যেন সেই প্রকার দশা ঘটিল! ঈশ্বরচন্দ্রের প্রতিভার কমনীয় কান্তির মধ্যে মধুসূদনের প্রদীপ্ত রশ্মি আসিয়া পড়িল। বঙ্গসাহিত্যের পাঠকগণ আননের সহিত এক নূতন জগতে প্রবেশ করিলেন। মধুসূদনের গ্রন্থাবলী যখন প্রকাশিত হইল, তখন বঙ্গসমাজে মহা আলোচনা উপস্থিত হইল। বঙ্গীয় পাঠকগণ মধুসূদনের স্বপক্ষ ও বিপক্ষ দুই দলে বিভক্ত হইলেন। এক দল “প্রদানিয়া”, “সাত্ত্বনিয়া” প্রভৃতি পদকে বাঙ্গালা ভাষার যথেচ্ছাচার বলিয়া উপহাস ও বিদ্রুপ করিতে লাগিলেন; এবং মধুসূদনের অনুসরণে কাব্য রচনা করিয়া তাহাকে অপদস্থ করিবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন। তাহার প্রমাণ স্বরূপ ‘ছুঁছুন্দরীবধ কাব্যের” উল্লেখ করা যাইতে পারে। যাহারা ইহার কিঞ্চিৎ আভাস পাইতে চান, তাঁহারা পণ্ডিত প্রবর রামগতি ন্যায়রত্ন মহাশরের রচিত বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিবৃত্তে উক্ত কাব্য হইতে উদ্ধৃতাংশ পাঠ করিয়া দেখিবেন। এক পক্ষ এক দিকে যখন এইরূপ বিরোধী, অপর পক্ষ অপরদিকে তেমনি গোঁড়া স্কুল ও কলেজের উচ্চশ্রেণীর অধিকাংশ বালক এই গোঁড়ার দলে প্রবেশ করিল। নব-প্রণীত অমিত্রাক্ষর ছন্দ কিরূপে ছন্দ ও যতির প্রতি দৃষ্টি রাখিয়া পড়িতে হইবে, তাহা সকলে বুঝিতে পারিত না; দুই একজন অগ্রসর চালাক ছেলে মধুসূদনের নিজের মুখে শুনিয়া আসিয়াছে বলিয়া আসিয়া আমাদিগকে পড়িয়া শুনাইত৷ এক জন পড়িত বিশ জনে শুনিত। আমরা ঐ চালাক ছেলেদিগকে খুব বাহাদুর মনে করিতাম। এইরূপে ইংরাজ কবি কাউপার যেমন পোপ ও ড্রাইডেনের ছন্দ নিগড়ে দৃঢ়বদ্ধ ইংরাজী কাব্যে স্বাধীনতা ও ওজস্বিতা প্রবিষ্ট করিয়া নবজীবন আনয়ন পক্ষে উপায়স্বরূপ হইয়াছিলেন, তেমনি মধুসূদনের অলৌকিক প্রতিভা ভারতচন্দ্র ও গুপ্ত কবির রচিত ছন্দ-নিগড় হইতে বঙ্গীয় কাব্যকে উদ্ধার করিয়া তাহাতে ওজস্বিত ঢালিয়া নবজীবনের সঞ্চার করিল! মধুসুদন প্রধানতঃ অমিত্রাক্ষর ছন্দে নিজ প্রতিভাকে প্রকাশ করিয়াছিলেন বলিয়া এরূপ মনে করিতে হইবে না যে, মিত্রাক্ষর ছদ রচনাতে তিনি কম নিপুণ ছিলেন। তাহার রচিত ব্ৰজাঙ্গনা কাব্য তাহার প্রমাণ। ইহাতে তিনি মিত্রাঙ্গরে সরস সুমিষ্ট কবিতাতে মধুঢালিয়া রাখিয়াছেন।